শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ ::

বাড়ছে ঋণ খেলাপিদের সুযোগ সুবিধা, বাড়ছে খেলাপি ঋণও

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯
  • ৪৫১ বার পঠিত

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। প্রতিবছরই এর পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। এ খাতের একটি বড় সমস্যা হল উচ্চ খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেনা দেশের ব্যাংকিংক খাত। খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের জন্য দুর্বিষহ বোঝা হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার কারা উপায় নেই। ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো। বড় ঋণগুলো আদায় হচ্ছেনা। ব্যাংকিং খাত ভেঙ্গে পড়লে পুরো অর্থনীতি চরম দুরবস্থায় পতিত হবে। বহু সংখ্যক ব্যাংক ও নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণে জর্জরিত। দেশের ঋণ গ্রহীতারা কেন খেলাপি হন, তার কারণ হিসাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিলেছিলেন, খেলাপি হওয়াটা লজ্জাজনক হলেও ঋণগহীতাদের মধ্যে সেটা নেই।

সূত্রঃ বাংলাদেশ ব্যাংক।

বলা যায়, খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করেছে। মাত্রতিরিক্ত খেলাপির প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। ফলে এগোতে পারছেনা ভালো উদ্যোক্তারা। পরিণামে বাড়ছেনা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। এ কারণে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিগত সময়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনর্গঠন, ঋণ পূনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদির মাধ্যমে খেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। ফলে খেলাপি ঋণ সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান হচ্ছেনা। সমাধানটি এমন হওয়া উচিত যাতে ঋণ খেলাপিরা যত বড় প্রবাবশালীই হোন, তাদের কাছ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা তৎপরতার পরও কমছে না খেলাপি ঋণ। উল্টো বেড়েই চলেছে আর্থিক খাতের ‘বিষফোড়া’খ্যাত খেলাপি ঋণের পরিমাণ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- এই তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ফলে এই মুহূর্তে এর পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। জুন শেষে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।

৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। তবে প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে আইএমএফের হিসাবে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এর সঙ্গে সাড়ে ছয় বছরের ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ কোটি ও ঋণ পুনর্গঠনের ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। যেগুলো খেলাপির পর্যায়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে আরও জানা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে ২ থেকে ৩ শতাংশ খেলাপি ঋণকে সহনীয় বলে ধরে নেয়া হয়। এর বেশি থাকলেই তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। আর খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ হলে সেটি হচ্ছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সে হিসাবে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ১২ শতাংশ। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কাজেই আর কোনো ঋণ যাতে খেলাপি না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের আদায় বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তিন মাস আগে (জুন শেষে) মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা।

সর্বশেষ ১৭ নভেম্বর মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদহারে ঋণ পুনঃতফসিলের (রিশিডিউলিং) সুবিধার সময়সীমা বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আরও ৯০ দিন সময় পাবেন আবেদনকারীরা। সূত্রমতে, এই সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল করে ইতিমধ্যে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে। তারপরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়নি।

খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাড়তি মূলধন রাখত হচ্ছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে রাখতে হচ্ছে প্রভিশন। এতে ব্যাংকগুলোর অর্থ আটকে থাকছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নানা ধরনের নীতিগত সুবিধা দেয়া হলেও বাস্তবে তা কমেনি, বরং আরও বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, যে জিনিসকে উৎসাহ দেয়া হয়, সেটা বাড়ে আর নিরুৎসাহিত করলে কমে। এখানে খেলাপিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে, তাই সেটা বাড়ছে। আর ভালো গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করার কারণে তাদের সংখ্যা কমছে। এটা পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

দেশে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা বিরাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল উচ্চ খেলাপি ঋণ। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বস্তুত খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই ঝুঁকি তৈরি করছে।

মাত্রাতিরিক্ত খেলাপির প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়, বিশেষত ঋণের সুদহারে। এ কারণে এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। ফলে বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।

অর্থমন্ত্রী ব্যাংক ঋণের সুদহার কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। শুধু অর্থমন্ত্রী নন, খোদ প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের প্রায় সব ব্যাংকই এ নির্দেশ অমান্য করে চলেছে তাদের নানা সমস্যার কথা বলে। এ অবস্থায় শুধু শিল্পঋণের সুদ ৯ শতাংশ তথা সিঙ্গেল ডিজিট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী এ সংক্রান্ত নির্দেশ দিয়েছেন।

আমরা আশা করব, এ নির্দেশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হবে। বস্তুত, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা গেলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা সহজ হবে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এ জায়গাটিতে দৃষ্টি দেয়া।

গত ১৬ মে’১৯ ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন ঋণ শোধসংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালায়, খেলাপি ঋণের মাত্র ২ শতাংশ জমা দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুবিধা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদ হার ঠিক করে দেয়া হয় ৯ শতাংশ। ১৬ মে ভালো ঋণগ্রহিতাদের প্রণোদনা দেয়ার বিষয়য়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আরেকটি নীতিমালা জারি করে। কিন্তু চলতি বছরের অক্টোবর মাস শেষ হলেও কোন ব্যাংকে ভালো গ্রাহকদেরকে প্রণোদনা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এধরনের তথ্য জানা যায়নি। ঋণ খেলাপিদের সুবিধা প্রক্রিয়া চালু হলেও ভালো ঋণ গ্রহিতাদের প্রণোদনার বিষয়টি চাপা পড়ে আছে।

‘বিপদগ্রস্ত’ গ্রাহকের সুদ মওকুফ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাধারণ নীতি। যদিও বাংলাদেশে এ নীতির অপব্যবহারের অভিযোগ বহুদিনের। গ্রাহকের সুদ মওকুফ না করে প্রভাবশালী ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সুদ অনেক ব্যাংক মওকুফ করে দিচ্ছে। শুধু গত ১০ বছরেই ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ঋণের সুদ মওকুফ করেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। যদিও মওকুফ না করা হলে এ টাকার পুরোটাই মুনাফায় যুক্ত হতো ব্যাংকগুলোর।

আমরা আশা করি ঋণ খেলাপির অর্থ আদায়ে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহন করবে অন্যদিকে ভালো গ্রাহকদেরকে উৎসাহমূলক প্রণোদনা প্রদানে ব্যাংকগুলোর প্রতি কঠোর নির্দেশনা জারী করবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41