ঢাকা শুক্রবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২২
চেক ডিসঅনার মামলা কখন কিভাবে করবেন
  • এম. এ. মাসুম
  • ২০২১-১২-২৯ ১৪:৪০:৪০

যদি কোন ব্যক্তি অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংক চেক দেয় এবং পরবর্তীতে সেই চেক টাকায় রূপান্তরিত না করতে পারলে চেক প্রদানকারী অ্যাকাউন্টধারীরের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকার কারণে চেক ডিজঅনার হলে চেক প্রদানকারী অ্যাকাউন্টধারীর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যাত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তহবিল অপর্যাপ্ততায় কোন চেক প্রত্যাখ্যাত বা ডিজঅনার হলে সেইসব অপরাধের প্রতিকারের সুরক্ষা বিধান করা হয়েছে নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের (এনআই অ্যাক্ট) ১৩৮, ১৪০ ও ১৪১ ধারায়।

এনআই অ্যাক্ট এ মামলা দায়ের করতে হলে কোন দায় অথবা ঋণ পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট চেক ব্যবহার করতে হবে। স্বাক্ষরিত চেকটি প্রদানকারী কর্তৃক ইস্যুর তারিখ থেকে ৬(ছয়) মাস সময়ের মধ্যে নগদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হবে।

চেকটি ব্যাংক কর্তৃক ডিসঅনারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান বরাবরে চেকের উল্লেখিত টাকা পরিশোধের জন্য ব্যাংকের প্যানেলভূক্ত আইনজীবির মাধ্যমে লিখিত আইনগত নোটিশ প্রদান করতে হবে।

চেকের উল্লেখিত টাকা পরিশোধের জন্য চেক প্রদানকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে আইনগত নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে।

এনআই অ্যাক্ট ৩৮ ধারা অনুযায়ী চেক তিনভাবে দাবি জানাতে হয়- (১) নোটিশ গ্রহীতার হাতে সরাসরি নোটিশ প্রদান করে অথবা প্রাপ্তি স্বীকারপত্রসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে চেক প্রদানকারীর জ্ঞাত ঠিকানায় এবং (২) সর্বশেষ বসবাসের ঠিকানা কিংবা বাংলাদেশে তার ব্যবসায়িক ঠিকানা বরাবর নোটিশ প্রেরণ করে। (৩) বহুল প্রচারিত কোনো জাতীয় বাংলা দৈনিকে নোটিশটি বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে।  এ তিন পদ্ধতির যে কোন একটা পদ্ধতি অনুসরণ করলে হবে।

লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ না করে সরাসরি মামলা করা যাবে না। নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চেকে উল্লেখিত পরিমাণ টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।

অভিযোগ নালিশি মামলা বা সিআর মামলা হিসেবে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করতে হবে। চেক ডিসঅনার মামলার আবেদনের সাথে যেসব তথ্য প্রয়োজন হয়ঃ

  • চেক প্রদানকারীর নাম
  • চেক প্রদানের তারিখ
  • চেক ডিসঅনার হওয়ার তারিখ
  • চেক লেনদেনের সংক্ষিপ্ত ঘটনা
  • ব্যাংকের নাম, ব্যাংক শাখার নাম, হিসাব নম্বর, চেক নম্বর ও টাকার পরিমাণ
  • যে কারনে চেকটি ডিসঅনার করা হয়েছে
  • চেক ডিসঅনার হওয়ার কথা জানিয়ে নোটিশ পাঠানোর প্রমান এবং নোটিশ ফেরত এসে থাকলে ফেরত আসার তারিখসহ অন্যান্য তথ্য
  • কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চেক দেয়া হয়ে থাকলে চেক ইস্যুকারী কর্মকর্তার নাম, পদবী ও প্রতিষ্ঠানের নাম।
  • আইনি নোটিশ বা বিজ্ঞপ্তির কপি
  • পোস্টাল রসিদ,

এসবের ফটোকপি ফিরিস্তি আকারে মামলার আবেদনের সঙ্গে জমা করতে হবে।

মামলা দায়ের করার পর সমন এবং ওয়ারেন্ট জারি করতে পারেন আদালত। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করলেও অপরাধের মূল বিচার হয় দায়রা আদালতে। দায়রা জজ তখন অন্য কোন দায়রা জজের নিকট বিচারের জন্য পাঠাতে পারেন।

চেক ডিজঅনারের মামলায় অপরাধের শাস্তি

সকল সাক্ষ্য প্রমান, জেরা, যুক্তিতর্কের পর আদালত রায় প্রদান করবেন। অপরাধ প্রমান হলে আইন অনুসারে শাস্তি হিসেবে এক বছর কারাদন্ড অথবা চেকে উল্লেখিত অর্থের তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করতে পারেন।

চেক ডিজঅনারের মামলায় আপিল

আদালতের রায়ের পরে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার মামলায় প্রদও দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে। দায়রা জজ অথবা অতিরিক্ত দায়রা জজের দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপীল দায়ের করতে হবে এবং যুগ্ম দায়রা জজের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজের নিকট আপীল করা যাবে।

চেক ডিজঅনারের মামলায় আপীল করার পূর্বশর্ত

১৩৮ ধারায় মামলার আপিল করার সুযোগ আছে। তবে আপিল করার পূর্বশর্ত হচ্ছে,চেকে উল্লেখিত টাকার ৫০ শতাংশ টাকা যে আদালত দণ্ড প্রদান করেছেন সেই আদালতে জমা দিতে হবে একাউন্টধারীকে।

এছাড়াও অনেক সময়ে দেখা যায় আসামিরা সাজা খেটেই বেরিয়ে যান। টাকা আর পরিশোধ করেন না। তখন বিচারিক আদালত চেকের মামলায় জরিমানার টাকা আদায়ে জেলা কালেক্টর বা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে দেওয়ানি আদালতে জারি মামলা দায়ের করতে হয়। যদি কোন কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে মামলা করা না যায় তাহরে দণ্ডবিধি ৪০৬ ও ৪২০ ধারা অনুসারে ফৌজদারি মামলা করা যায়।

কিন্তু এসব মামলার ক্ষেত্রে টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। দোষী সাব্যস্ত দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় হলে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃক চেকটি অপরিশোধিত অবস্থায় ফেরত আসার অর্থাৎ ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে একাউন্টধারীকে চেক ডিজঅনার হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে চেকে উল্লিখিত অংকের টাকা প্রদানের দাবি জানাতে হবে।

চেক ডিজঅনার কোথায় মামলা করবে

অভিযোগ বা নালিশি মোকাদ্দমা সি.আর মামলা হিসেবে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এবং মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। মামলা দায়ের করার সময় আদালতে মূল চেক, ডিজঅনারের রশিদ, লিগ্যাল নোটিশ, পোস্টাল রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকার রশিদ আদালতে প্রদর্শন করতে হবে। এসবের ফটোকপি ফিরিস্তি আকারে মামলার আরজীর সঙ্গে আদালতে জমা করতে হবে। আদালত মোকাদ্দমাটি গ্রহন করলে বিবাদীর নামে সমন অথবা ওয়ারেন্ট জারি করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলা গ্রহন করলেও মামলাটি মূল বিচার করা হয় দায়রা আদালতে।

চেক ডিজঅনার মামলায় আজিমকে যে সকল বিষয় প্রমান করতে হবে

চেক ডিজঅনারের মামলায় বাদীকে অনেক বিষয় প্রমান করতে হয় এবং সে সকল বিষয় প্রমান করতে পারলে আসামীকে শাস্তি দেওয়া যাবে ।

১। আসামী বাদীকে চেক প্রদান করেছে ।

২। ঋণ বা দায়-দেনা পরিশোধের জন্য আসামী বাদীকে চেক প্রদান করেছে।

৩। ঋণ বা দায়-দেনা আসামী আইনুগভাবে পরিশোধ যোগ্য।

৪। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেক ডিজঅনার হয়েছে।

৫। চেক ডিজঅনারে সময় থেকে ৩০ দিন এর মাঝে আসামীকে টাকা পরিশোধের জন্য

লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।

৬। আসামী নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের ভিতরে চেকে উল্লেখিত টাকা বাদীকে পরিশোধ ব্যর্থ হয়েছে।

৭। আসামী ব্যাবসায়িক লেনদেনের কারনে বাদীকে চেক প্রদান করলে বাদীকে আসামীর সাথে  তার ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিল প্রমান করতে হবে।

চেক হারিয়ে গেলে কি করবেনঃ

চেক হারিয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব আপনার নিকটস্থ থানায় গিয়ে একটি সাধারন ডাইরী (জিডি) করবেন। অথবা আপনার চেক যে স্থানে হারিয়ে গিয়েছে তার নিকটস্থ থানায় গিয়ে একটি সাধারন ডাইরী (জিডি) করতে পারেন। জিডির সত্যায়িত কপি হিসাবধারী ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংক এর সংশ্লিষ্ট শাখায় উপস্থিত হয়ে জিডির কপিটি জমা দেবেন। এক্ষত্রে আপনার হারিয়ে যাওয়া চেক দিয়ে কেও আপনার ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবে না। আর আপনি যদি চেক ডিসঅনারের মামলা দায়ের করার পর মূল চেক, ডিজঅনারের রশিদ, পোস্টাল রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকার রশিদ হারিয়ে ফেলেন তাহলে যে স্থানে হারিয়ে গিয়েছে তার নিকটস্থ থানায় গিয়ে একটি সাধারন ডাইরী (জিডি) করতে পারেন হবে। আপনার মামলার সাক্ষ্য গ্রহন সহ অনেক ক্ষেত্রে  জিডির সত্যায়িত কপি প্রয়োজন হবে।

আবার চেক ডিসঅনার হয়ার পর ডিসঅনার স্লিপ সহ চেক হারিয়ে গেলে এ বিষয়ে থানায় জিডি করে ১৩৮ ধারায় মামলা করা হয় তাহলে মামলার বাদীকে সাক্ষ্যকে সমর্থন করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিলে ধরে নেয়া হয় যে বাদী তার মামলায় উক্ত বিষয়ে প্রমানে সক্ষম হয়েছেন।

চেক ডিজঅনারের মামলায় বাদী/আসামী মৃত্যু হলে

চেক ডিজঅনারের মামলায় বাদী/আসামী কোন এক পক্ষ মারা গেলে মামলাটি শেষ হয়ে যায় অনেকে মনে করেন। ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনারের মামলায় এমনটি ঠিক নয়। চেক ডিজঅনারের মামলা অন্য সকল ফৌজদারী মামলা থেকে একটু আলাদা এবং এটি কিছুটা দেওয়ানী প্রকৃ্তির হওয়ায় বাদী অথবা আসামীর মৃত্যুর কারনে মামলা শেষ হয়ে যায় না। বাদীর মৃত্যুর পর তার বৈধ প্রতিনিধি মালার বাদী প্রক্ষভুক্ত হয়ে মামলা পরিচালনা করতে পারবে। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় আসামীর মৃত্যু হলে মামলার আরজী সংশোধন করে মামলা চলানো যায়। মামলা চলমান অথবা মামলা করার পূর্বে আসামীর মৃত্যু হলে বাদীর একমাত্র প্রতিকার হলো আসামীর বৈধ প্রতিনিধি বিরুদ্ধে দেওয়ানী আদালতে টাকা আদায়ের মামলা করে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা।

মৃত ব্যক্তির ব্যাংকের গচ্ছিত অর্থ কে পাবে? উত্তরাধিকার না নমিনি
চেক ডিসঅনার মামলা কখন কিভাবে করবেন
সাধারণ ব্যাংকিং