শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

করোনাকালে বেসরকারী ব্যাংক কর্মীদের ছাঁটাই ও পদোন্নতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ১৪২৮ বার পঠিত

প্রাণঘাতী ভাইরাস কোভিড-১৯ এর থাবায় ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ সহ গোটা বিশ্ব। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক হতে পারছেনা। সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য মহামারী শুরু হওয়ার পর দেশের সমস্ত সরকারী বেসরকারী অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করা হয়, শুধু ব্যাংক খোলা থাকে। মহামররী উপেক্ষা করে অকুতভয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা সে সময়েও ডাক্তার, অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য সম্মুখযোদ্ধাদের ন্যায় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংকিং সেবা দিয়ে এসেছেন।ফলে হাজার হাজার ব্যাংক কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন এমন সংখ্যাও কম নয়।

ব্যাংকররা যখন মহামারী আক্রান্ত ও মৃত্যু ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ব্যাংকিং সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন বেসরকারী ব্যাংক কর্মীদের ছাঁটাই কার্যক্রম শুরু হলো। সেসাথে শুরু হলো বেতন ভাতা হ্রাস করা। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় এ পর্যন্ত বিভিন্ন বেসরকারী ব্যাংকের প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে।

গতমাসে লংকাবাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের রিসার্চ টিমের সহায়তায় বণিক বার্তা পত্রিকা ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর র‍্যাংকিং প্রকাশ করেছে। র‌্যাংকিংয়ে ভালো ব্যাংকের মধ্যে শীর্ষ দশের মধ্যে যেসব ব্যাংকের অবস্থান ছিল সে সব ব্যাংকও কর্মী ছাঁটাই করেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো থাকার পরও কেন তাদের কর্মী ছাঁটাই করা হলো? আর্থিকভাবে ভালো এসব ব্যাংকের কর্মীদের প্রতি কি কোন দায়বদ্ধতা নেই? শীর্ষ নির্বাহীরা শুধু নিজেদের অবস্থানের পাকাপোক্ত করতেই ব্যস্ত, প্রতিষ্ঠানে মানবতা বলতে কিছুই নেই? মজার বিষয় হলো এসব শীর্ষ কর্তারাই আবার বক্তৃতার মঞ্চে মানবতা নিয়ে উচ্চমানের বক্তৃতা দিয়ে থাকেন।

অনেক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য অধস্তনদের পিঠে ছুরি চালাতেও দ্বিধা বোধ করেননা। নিজের পদকে আঁকড়ে ধরে রাখা, মালিক পক্ষকে ভুল বুঝিয়ে নিজের অবস্থানকে অধিক শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাতে অধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মানবতাকে জুতোপিষ্ঠ করে শত শত হতভাগ্য অধস্তন কর্মকর্তারা বলীর স্বীকার হন। আমরা দেখলাম বেশ কয়েকটি ব্যাংক করোনা মহামারীর আর্থিক শংকটকালীন সময়ে বেশ কিছু কর্মকর্তাদেরকে চাকুরিচ্যুত করল, অথচ তাদের চাকুরিটি বড় প্রয়োজন ছিল। চাকুরী হারিয়ে তারা এখন মানবেতর জীবন যাবন করছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আহাযারি করতে দেখা গেল। ফেসবুকে একজন লিখেছেন তার মোবাইল রিজার্জ করার মত সামর্থ নেই। কিন্তু কে শুনে কার কথা!

ব্যাংকের দুর্বল অবস্থানের জন্য কখনো ব্যাংক কর্মীরা দায়ী নন। যদি দায়ী করা তাহলে বলা যায় শীর্ষ নির্বাহীদের নতযানু অবস্থান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের বিভিন্ন সমস্যার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে শীর্ষ কতৃপক্ষের সীমাহীন দুর্নীতি,ক্ষমতার অপব্যাবহার, মালিকপক্ষের পরিবারতন্ত্র, উদ্যোক্তা পরিচালকদের লুটপাট ও অনিয়ম, পাচার, বেনামিতে লুটপাট, রাজনৈতিক পেশিশক্তির অপব্যবহার সর্বোপরি ব্যাংক লুটেরাদের বিপক্ষে সরকারী নীতির দুর্বল অবস্থান ইত্যাদি। এসব সমস্যার সমূলে উৎপাটন করতে পারলে একজন ব্যাংক কর্মীরও চাকরীচ্যূতির প্রয়োজন হবে না।

ব্যাংক কর্মীরা এখনো তাদের অস্তিত্ব নিয়ে আতঙ্কে আছেন। চাকুরির আতঙ্ক থাকলে মনোবল ভেঙ্গে যায় এটাই স্বাভাবিক। বেসরকারী ব্যাংকারদের খারাপ সময়ে একটি হঠাৎ গতকাল একটি ভালো খবর প্রকাশ হলো। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড ৫৫০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে।

জানা যায়, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার রাশেদ মাকসুদ নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে কাটিয়েছেন।ফুসফুসের সংক্রমনসহ গুরুতর অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেই তিনি কর্মীদের পদোন্নতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এমন একটি মানবিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাগণ।

পদোন্নতির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেছেন, মহামারীতে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে ব্যাংকাররা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। এ অবস্থায় কর্মীদের অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্যই পদোন্নতি দেয়ার দরকার ছিল। সবদিক বিবেচনায় রেখেই আমরা ৫৫০ জন কর্মীকে পদোন্নতি দিয়েছি। ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের আন্তরিক সহযোগিতায় এটি সম্ভব হয়েছে। মহামারীর এ সময়ে কাজটি কষ্টকর হলেও আমাদের মানবসম্পদ বিভাগ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। গত দুই সপ্তাহ আমার নিজের শরীরের উপর দিয়েও ঝড় বয়ে গেছে। আপাতত হাসপাতাল থেকে ছাড় পেলেও চিকিৎসকরা এক মাস বিশ্রামে থাকতে বলেছে বলে তিনি জানান।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহামারি সবকিছুকেই থামিয়ে দিতে পারেনা। মহামারির সাথে যুদ্ধ করেই টিকে থাকতে হবে। সে জন্য ব্যাংকারদের মনোবলকে উদ্দীপ্ত রাখার স্বার্থে পদোন্নতি সহ বিভিন্ন মানবিক প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এ ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্যান্য ব্যাংকের জন্য অনুকরণীয় হলো। ব্যাংকাররা মনে করছেন, করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে মহামারিজনীত চাকুরিচ্যুত কর্মীদেরকে আবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ফিরিয়ে আনা উচিত। কারণ ব্যাংকের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র অর্থ উপর্জন নয়, মানবিকতা প্রতিষ্ঠার জন্যও। করানাকালীন সময়ে বেসরকারী ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় অধীন মনোযোগী হবে এটাই সবার প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41