বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ০৯:০৭ পূর্বাহ্ন

ঘুর্নিঝড় “বুলবুল” এর নামকরণ এবং সতর্ক সংকেতের অর্থ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯
  • ৪৫৬ বার পঠিত
Image result for ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল'

বাংলাদেশের উপকূল এলাকার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। শুক্রবার (৮ নভেম্বর’ ১৯) বিকেল থেকেই ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস। হবে। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ক্রমশ এগোচ্ছে এই ঘূর্ণিঝড়। ঝোড়ো  বাতাসের গতিবেগ থাকবে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার। আজ–-কাল–পরশু ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস। সমুদ্র তীরবর্তি এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, মাইকিং করা হচ্ছে। সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে মৎস্যজীবীদের। উপকূলবর্তী মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার এবং জাহাজকে নিরাপদ দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে মোংলা ও পায়রা বন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখানোর পর খুলনার উপকূলীয় চার উপজেলা দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটার শত শত মানুষ আতঙ্কে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে। শনিবার সকাল ১০টার পর থেকে মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে যাওয়া শুরু করে।

‘ফণী’র পর আরও এক ঘূর্ণিঝড় আতঙ্কে দেশবাশী। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া গভীর নিম্নচাপ ‘বুলবুল’ প্রবল আকার ধারণ করেছে। আগামী ৫ থেকে ৬ ঘন্টায় যা তীব্রতর হবে। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ক্রমশ এগোচ্ছে এই ঘূর্ণিঝড়।

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে ভারতীয় এ সংবাদ মাধ্যমটি জানায়, শনিবার রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে কলকাতার সাগরদ্বীপ থেকে বাংলাদেশের পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়ার মধ্যে অতি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়টি আছড়ে পড়তে পারে। রাতেই স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে। তবে এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলছেন না আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা।

সাগরদ্বীপ থেকে খেপুপাড়ার মধ্যে ঘূণিঝড় ‘বুলবুলের’ বিস্তার থাকলেও দিল্লির আবহাওয়া অফিস বলছে, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাতহানার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতের সুন্দরবন এলাকায়।

ভারতের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের ঘূর্ণিঝড় বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে, এই ধরনের ঘূর্ণিঝড় অনেকটা জায়গা জুড়ে আঘাত হানে। বুলবুলও অনেকটা জায়গা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়বে। এখন পর্যন্ত যা গতি প্রকৃতি বোঝা যাচ্ছে, তাতে সুন্দরবন এবং তার আশপাশেই ‘বুলবুল’ আছড়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছে।

কলকাতার আবহাওয়া অফিস সূত্রে খবর, কলকাতা থেকে ‘বুলবুলের’ দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার। আর বাংলাদেশের খেপুপাড়া থেকে বুলবুলের দূরত্ব কমে ৪৮৫ কিলোমিটারে এসেছে। এতে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগও ক্রমশই বাড়ছে।

এদিকে কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া অফিস বলছে, সমুদ্রে ‘বুলবুলের’ গতিবেগ বেশি থাকলেও স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় তার গতিবেগ কমে যাবে। কিন্তু যেভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বুলবুল, তাতে মনে করা হয়েছে স্থলভাগে আছড়ে পড়লেও গতি হবে ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। আর যদি শেষ মুহূর্তে শক্তি বেড়ে যায়, তাহলে ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার গতিতেও পৌঁছে যেতে পারে।

হলুদ সতর্কতার অর্থ, গুরুতর রকমের খারাপ আবহাওয়া আশা করতে পারেন। কোথাও সফর করার থাকলে, অথবা দৈনন্দিন কাজেও, ব্যাঘাত ঘটাতে পারে আবহাওয়া, অতএব নেহাত জরুরি না হলে দূরপাল্লার সফর স্থগিত রাখাই ভালো। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাতে থাকা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে হাওয়া অফিস, এবং জনগণের উদ্দেশে বার্তা হলো, নজর রাখুন আপনারাও, কারণ যে কোনও সময় অবস্থার অবনতি হতে পারে।

ঘুর্ণিঝড়ের নাম বুলবুল হল কী করে?

আবহাওয়া বিজ্ঞানের পরিভাষায়, ‘সাইক্লোন বুলবুল’ বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ আখ্যা পেয়েছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ উপকূলের আরও কাছাকাছি আসবে সে। তা এহেন ভয়ঙ্কর ঝড়ের এমন ফুরফুরে নাম কেন? আবহাওয়াবিদরা কি ইয়ার্কি করছেন আমাদের সঙ্গে? তা ঠিক নয়, তবে এখানে ব্যঙ্গের একটা ভূমিকা রয়েছে বটে। যেমন এই ফুরফুরে নামকরণ করেছেন পাকিস্তানের আবহাওয়াবিদরা।

কীভাবে হলো এই নাম রাখা? বুলবুলের পাশাপাশি গুজরাট উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ‘সাইক্লোন মাহা’। তার আগে ‘ফণী’, অথবা ‘বায়ু’, অথবা ‘তিতলি’, আমাদের সকলেরই ভালোরকম মনে আছে। এখন কথা হচ্ছে, এইসব নাম কে বা কারা রাখে? আসলে এ নামগুলো রাখে বিভিন্ন দেশ।

তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, এই প্রথা প্রথম চালু হয় অ্যাটল্যান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে। যেসব ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩৯ মাইল ছাড়িয়ে যেত, তাদের বিশেষ সম্মান জানাতে নামকরণ করা হতো। ঘণ্টায় বাতাসের গতিবেগ ৭৪ মাইল ছাড়িয়ে গেলে হারিকেন, সাইক্লোন, বা টাইফুন হিসেবে ভাগ করা হতো। বর্তমান যুগে এই তিনটির একটি হলে তবেই কোনও ঝড়কে নামকরণের সম্মান প্রদান করা হয়।

আজকের দিনে ট্রপিক্যাল সাইক্লোনের আনুষ্ঠানিক নামকরণ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিকাল অর্গানাইজেশনের আওতায় এগারোটি সতর্কতা কেন্দ্রের যে কোনও একটি। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সব নাম জমা পড়ে এই সংস্থার আঞ্চলিক ট্রপিক্যাল সাইক্লোন কমিটির কাছে। একবার নাম চূড়ান্ত হয়ে গেলে তা বদল করা যায় না, যদি না ঝড়ের ফলে খুব বেশি মাত্রায় মৃত্যু অথবা সম্পত্তি বিনষ্ট হয়। যেমন ধরুন, ‘ফণী’ নামটা রেখেছিল বাংলাদেশ। এই নামকরণের প্রস্তাব গ্রহণ করে দিল্লির রিজিওনাল স্পেশালাইজড মিটিওরোলজিকাল কেন্দ্র।

cyclone bulbul ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে ঝড়ের নামের তালিকা। ‘বুলবুল’-এর পরে আসছে ‘পবন। ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিকাল অর্গানাইজেশন একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে যার দ্বারা বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ঝড়ের নামের তালিকা গ্রহণ করে তারা। প্রয়োজন মতো এই সমস্ত তালিকা থেকে বেছে নেওয়া হয় নাম। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এই আটটি দেশের তরফে আটটি করে ভবিষ্যতের সাইক্লোনের নাম জমা করা হয়েছে। সেই ৬৪ টি নামের তালিকা থেকেই বেছে নেওয়া হয় ‘ফণী’, ‘তিতলি, বা ‘আইলা’। বর্তমানে এই তালিকার শেষ স্তম্ভ থেকে নাম বাছা হচ্ছে, ফলে এই অঞ্চলে পরবর্তী সাইক্লোনের নাম হতে চলেছে ‘পবন’, সৌজন্যে শ্রীলঙ্কা।


প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। বিভিন্ন নামে ডাকা হয় ঘূর্ণিঝড়গুলিকে। প্রশ্নও ওঠে, ঝড়ের এত ভিন্ন ভিন্ন নাম কেন? কী ভাবেই বা হয় এই নামকরণ? আসলে, ভারত মহাসাগরে হওয়া সমস্ত ঝড়ের ক্ষেত্রে এই নামকরণের দায়িত্ব রয়েছে মূলত ৮টি দেশের উপর। ভারত, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কা। এই আটটি দেশ পালা করে ঝড়গুলির নামকরণ করে। সেই ক্রমে বুলবুলের নামকরণ করেছে পাকিস্তান। ঠিক যেমন কয়েকমাস আগের ঝড়ের নাম ‘ফণী’ দিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ভারত মহাসাগর সংলগ্ন দেশগুলির আবহাওয়া ভিত্তিক আঞ্চলিক কমিটির ভাণ্ডারে রয়েছে আর কেবল দু’টি নাম। পরবর্তী দু’টি ঝড়ের নাম হতে পারে পবন (শ্রীলঙ্কা) ও আমফান (থাইল্যান্ড)। তালিকায় এরপর আরও কোনও নাম নেই। কিন্তু তারপর? সেই নিয়েই এখন চিন্তাভাবনা করছে ওই কমিটি। কারণ সিডার (ওমান), নার্গিস (পাকিস্তান), বিজলি ( ভারত), আয়লা (মালদ্বীপ) এছাড়াও অন্যান্য ঝড়ের নামও ব্যবহার হয়ে গিয়েছে। নিয়মানুসারে এই নামগুলি আর দ্বিতীয়বার আর ব্যবহার করা যাবে না। আসলে ঝড়ের এই নামকরণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলেছিল। ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয় পৃথক নাম দেওয়ার পালা। তার আগে স্থানভিত্তিক নামেই সামুদ্রিক ঝড়গুলি পরিচিত হত।

ঘূর্ণিঝড়ের কোন সতর্ক সংকেতের অর্থ কী?

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে নদী ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে ১ থেকে ১১ পর্যন্ত সতর্ক সংকেত দেখানো হয়। যদিও আবহাওয়া বিভাগ উপকূলীয় এলাকাগুলোর জন্যও সতর্কতা হিসেবে একই সংকেত ব্যবহার করে। এই সংকেতগুলোর প্রতিটির পৃথক পৃথক অর্থ রয়েছে।

আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ১ নম্বর হচ্ছে দূরবর্তী সতর্ক সংকেত, ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত, ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত, ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত, ৫, ৬ ও ৭ বিপদ সংকেত, ৮, ৯ ও ১০ মহাবিপদ সংকেত এবং ১১ ঘূর্ণিঝড়ের প্রচণ্ডতার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।

৮ থেকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ও ১১ নম্বর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সংকেত বোঝাতে তিনটি লাল পতাকা ওড়ানো হয়ে থাকে। ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের অর্থ— প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় হবে এবং বন্দরের আবহাওয়া খুবই দুর্যোগপূর্ণ থাকবে। ঝড়টি চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষিণ দিক দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে (মোংলা বন্দরের বেলায় পূর্ব দিক দিয়ে)।

৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের অর্থ হলো— প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বন্দরের আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ থাকবে। ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম বন্দরের উত্তর দিক দিয়ে উপকূল অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে (মোংলা বন্দরের বেলায় পশ্চিম দিক দিয়ে)।

১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের অর্থ প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বন্দরের আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ থাকবে এবং ঘূর্ণিঝড়টি বন্দরের খুব কাছ দিয়ে, অথবা ওপর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

১১ নম্বর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সংকেতের অর্থ হলো- ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং স্থানীয় আবহাওয়া কর্মকর্তার বিবেচনায় চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41