রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০১:৩৬ পূর্বাহ্ন

ব্যাংক শাখার নিরপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২০
  • ৮৪২ বার পঠিত

চুয়াডাঙ্গায় সোনালী ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনা নিয়ে সারাদেশে সব ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১০ হাজার শাখার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকে সুড়ঙ্গ করে ১৬ কোটি টাকা লুট হয়েছে। রাজধানীর অদূরে সাভারে বাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকপাড়ায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। অপরদিকে ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেশের সব ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়ে। ২০১৫ সালের ওই গাইডলাইন প্রজ্ঞাপণ আকারে প্রকাশ করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে। ওই গাইডলাইনে ব্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা শুধু কাগজে কলমে রয়েছে। ঢাকার বাইরে অধিকাংশ জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাংকের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সারাদেশে সব ব্যাংকের নিরাপত্তায় ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ২০১৫ সালে ৫ জুলাই একটি সার্কুলার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে বাংকের শাখাসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, দেশের ব্যাংকের শাখাসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় সার্কুলার জারি করে।

সার্কুলারে রয়েছে- ১. ব্যাংক স্থাপনার অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংক শাখার প্রবেশ পথে, শাখার অভ্যন্তরে, শাখার বাইরে চর্তুদিকে এবং সব ধরনের আইটি রুমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসিটিভি বা আইপি ক্যামরা বা স্পাই ক্যামরা স্থাপন করতে বলা হয়েছে , আর সেগুলো ব্যাংকের সেন্টাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। আর নিরাপত্তায় সিসিটিভিগুলো যেন সার্বক্ষণিক সচল থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি অপারেশনের জন্য একসেস কন্ট্রোল সিস্টেম চালু করতে হবে। একসেস অথোরাইজেশন কোন ক্রমেই ডেলিগেট করা যাবে না। নির্ধারিত কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে সমমানের অথবা তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তাকে একসেস কন্ট্রোলের দায়িত্ব দিতে হবে। সিসিটিভির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক স্থাপনায় ধারণকৃত সব সিসিটিভি ভিডিওফুটেজ ধারণের সময় হতে ন্যূনতম এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে।

২. ব্যাংকের সব শাখায় পর্যায়ক্রমে এন্ট্রি থেফট এলার্ম স্থাপন করতে হবে।

ব্যাংক ভোল্টের নিরাপত্তার বিষয়টি অধিকতর শক্তিশালী ও মজবুত করার লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওইসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে-

ক. কাঠামোগত নিরাপত্তা : রাষ্ট্র মালিকাধীন ব্যাংকসমূহ তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ভোল্ট রুমে ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্ধিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদন (যা ওই ব্যাংকসমূহের কাছে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর পাঠানো) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য ব্যাংকসমূহ তাদের ভোল্ট স্পেস বিশেষভাবে সুরক্ষিত করার জন্য তাদের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত নীতিমালার আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভবনের মেঝে ও ছাদসহ ভল্টের চারপাশে নির্মিত দেয়ালের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয়টি পুরপ্রকৌশলী কর্তৃক প্রত্যায়িত হতে হবে।

খ. প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা : ভল্টের সিকিউরিটি আলোর সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভল্টের সিকিউরিটি সিস্টেমের সঙ্গে ব্যাংকের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের নিরবচ্ছিন্নভাবে সংযোগের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভল্টের অভ্যন্তরে অটোমেটেড ফায়ার এক্সটিংগুইশার স্থাপন করতে হবে।

গ. ভল্টের নগদ অর্থ সংরক্ষণ সীমা : ভল্টে সীমাতিরিক্ত নগদ অর্থ যেন সংরক্ষণ করা না হয় সেই বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।

ঘ. বীমা নিরাপত্তা : রাষ্ট মালিকাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের তাদের ভল্টে রক্ষিত অর্থের ওপর অনাকাক্সিক্ষত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পৃথকভাবে তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। অন্য ব্যাংকে তাদের ভল্টে রক্ষিত সব অর্থের পূর্ণ বীমা আচ্ছাদন নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ব্যাংকের নিরাপত্তাপ্রহরী নিয়োগের আগে তাদের ব্যাপারে সব তথ্য সংরক্ষণ রাখতে হবে।

৫. সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নিরাপত্তার জন্য অধিকসংখ্য সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত করতে হবে।

৬. ব্যাংকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরীদের অস্ত্র চালানোর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

৭.ব্যাংক স্থাপনায় চুরি, ডাকাতিসহ যে কোন ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকবিলা ও প্রতিরোধের জন্য তরিৎ পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি ব্যাংক শাখায় অটো এলার্ম সিস্টেম চালু করতে হবে। ওই সিস্টেমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, নিকটবর্তী থানা, র‌্যাব অফিসসহ অন্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নম্বরে হটলাইন সংযোগ থাকতে হবে।

৮.ব্যাংক শাখার চারপাশে বসবাসকারী বাসিন্দাদের বা অবস্থানকারীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তা সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণ রাখতে হবে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

৯. সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর রাতে আকস্মিক সুনিদিষ্ট কর্মকতা বাংক শাখা পরিদর্শন করবেন। এসব নির্দেশ পালন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সার্কুলার (প্রজ্ঞাপণ) জারি করা হয়েছিল।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সার্কুলার জারির আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মতো ব্যাংকের নিরাপত্তা দেয়া হতো। ২০১৫ সালের এ আইনের পর কিছু প্রাইভেট ব্যাংক ছাড়া অনেক ব্যাংকে এখনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল রয়েছে। এখন ঈদসহ বিভিন্ন ছুটিতে মতিঝিলসহ রাজধানীর ব্যাংকপাড়ার বাড়তি নিরাপত্তা নেয়া হলেও অনেক ব্যাংকের নিরাপত্তা এখনও দুর্বল রয়েছে। নামমাত্র দু’জন প্রহরী খালি হাতে নিরাপত্তা দিচ্ছে যা পর্যাপ্ত নয়।

জানা গেছে, গত নভেম্বরে চুয়াডাঙ্গায় সোনালী ব্যাংকে দুর্বৃত্তরা খেলনা পিস্তল, পিপিই ও মাস্ক পরে তিন দুর্বৃত্ত ৮ লাখ টাকার বেশি লুট করেছে। সে ব্যাংকের নিরাপত্তায় চরম গাফিলতি ছিল বলে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা জানিয়েছেন। এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জে সুড়ঙ্গ করে সোনালী ব্যাংকে ঢুকে ১৬ কোটি টাকা লুট করেছে। এর আগে সাভারের আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এভাবে বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকগুলোতে টাকা লুট ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা গাফিলতি বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা নির্দেশনা না ফলো না করার কারণে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। এছাড়া ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। এদিন দুপুরে এক ব্যক্তি প্রিমিয়ার ব্যাংকের বাড্ডা লিংক রোড শাখায় হানা দিয়ে টাকা লুটের পর সিসি ক্যামেরার ডিভিআরও (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার) নিয়ে যায়। ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে নয়জনকে জিম্মি করে ২৩ লাখ টাকা লুট করে। বাংলাদেশের ব্যাংক লুটের এমন বহু ঘটনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকগুলোতে যেন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়া হয়, সেজন্য প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেও কিছু ব্যাংকে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে। তবে কোন ব্যাংকই চায় না এমন ঘটনা ঘটুক এবং মার্কেটে তাদের বদনাম হোক। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনার পরই তা অনুসন্ধানের জন্য নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে। রিপোর্ট হাতে পেলে জানতে পারব সেদিন কেন এই ঘটনা ঘটেছিল এবং সরকারি একটি ব্যাংকে কেন সিসি ক্যামেরা ছিল না।’

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41