বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

বাড়ছে করোনা, বাড়ছে চাকুরী ঝুঁকি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২০
  • ১৩৬৫ বার পঠিত

এম. এ. মাসুম

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশেও প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটি আঘাত এনেছে। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে প্রতিদিনই রাজধানীর ঢাকায় নতুন নতুন এলাকায় করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপে ব্যবসা-বাণিজ্যের এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে সমগ্র বিশ্বসহ বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা চরম নিবর্তনে পতিত হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফাণ্ড (আইএমএফ), মরগান স্ট্যান্লি, গোল্ডম্যান স্যাক্সসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী মন্দার ঘোষণা দিয়েছে।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বের ৮১ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। কোডিভ-১৯ পরিস্থিতি ও কর্মসংস্থানে প্রভাব বিষয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে। সারা বিশ্বেই বেকারত্ব বাড়ছে। করোনা সংকট মোকাবিলায় অনেক প্রতিষ্ঠানই কর্মী ছাঁটাইয়ের চিন্তায় আছে। এতে করে বেতন দিতে হবে কম। ক্ষতি কিছুটা পোষাবে। বা ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে ফ্লো-তে আসতে টুকটাক সময় লাগবে, তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত।

আইএলওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী বিশ্বে এখন প্রতি পাঁচ জনের চার জন শ্রমশক্তি কোনো না কোনোভাবে করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে বা নেবে-এর ওপরেই শ্রমবাজারে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নির্ভর করছে।

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতির যে বেহাল দশা তৈরি হয়েছে তার প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো ও ব্রিটেনের ৬ কোটি মানুষ স্থায়ী বা সাময়িকভাবে চাকরি থেকে ছাঁটাই হতে পারেন। এ ছাড়া তাদের মজুরি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। প্রতি চারজন কর্মজীবীর একজন এমন ঝুঁকিতে রয়েছেন। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেছে। চীনে প্রায় ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলা চীনের অর্থনীতি ১৯৭৬ সালের পর প্রথমবারের মত সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। বিশ্বের ৩৩০ কোটি কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি কোনো না কোনোভাবে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত।

বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতির চাকা শ্লথ হওয়ার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াও পুরো বিশ্ব এখন বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের শঙ্কায় বিপর্যস্ত। করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে শ্রমবাজারের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিতদেরও ঝুঁকি বাড়ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে রফতানি ও আমদানির মাধ্যমে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর পরিমাণ ৩৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধান রফতানি কেন্দ্র। আবার মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলো বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম উৎস। সুতরাং সেসব দেশের ওপর করোনাভাইরাসজনিত অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের মারাত্নকভাবে পড়ছে।

জানা যায় ব্যবসায়ী ক্ষতি হ্রাস বা অপারেটিং খরচ কমাতে অনেক ব্যবসায়ী তাদের ক্যাশ-ফ্লো ম্যানেজ করার লক্ষ্যে কর্মী ছাঁটাইয়ের কথা ভাবছেন। ব্যবসার অপারেটিং খরচ কমানোর আরও অনেক রকম উপায় থাকলেও, কর্মী ছাঁটাই ব্যাপারটাই অনেক সময়ে সবার আগে চলে আসে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি কর্মী ছাঁটাই না করে বর্তমান বেতন ১০/২০ শতাংশ হ্রাসও করতে পারে। ইতোমধ্যেই দেশের বেশ কয়েকজন লেখক, বুদ্ধিজীবী তাদের লেখালেখিতে এধরনের পরামর্শও দেয়া শুরু করেছেন।

বাংলাদেশে অর্থনীতির অন্য খাতের চেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখিন দেশের ব্যাংকখাত। বিশ্বের অনেক দেশে ইত্যোমধ্যে কর্মীও ছাঁটাই শুরু করেছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানও তাদের কর্মী-পরিসর ছোট করার চিন্তা করার কথা শুনা যাচ্ছে।সবই নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি কতদিন দীর্ঘায়ীত হয় তার উপর।

একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন,এই মুহুর্তে আমরা কর্মী ছাঁটাই এর কোন উদ্যোগ বা পরিকল্পনা করিনি। তাঁর কথার মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে যে, তাহলে কোন ব্যাংক এ ধরনের পরিকল্পনা করছে কিনা?

সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় আছেন ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সীমিত আকারে ব্যাংক লেনদেনে হলেও সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে দেশের ব্যাংকবহির্র্র্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০০ শাখায় কর্মরত ৮ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কার্যত এখন ঘরে বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন।আগেই জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ স্থগিত করায় ঋণ আদায় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এরপরও করোনার কারণে সব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় শূন্যের কোটায় নেমে গেছে। এমনি পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এ খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা। একে তো আয় শূন্যের কোটায়, এর ওপর সামনে ঈদ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা দিতে হবে; সব মিলে মহাবিপদে আছেন তারা।

ছাঁটাই আতঙ্ক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। শিওর ক্যাশ ইতোমধ্যেই ২০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে। বহু গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ প্রায়। অনেক প্রিন্ট ও ইলকট্রনিক মিডিয়া বন্ধ হয়ে পড়ায় বহু কর্মী বেকার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ আছে। ফলে বীমা প্রতিষ্ঠানেও আর্থিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে জানা যায়। এনজিওগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

এমনিতেই খেলাপি ঋণে জর্জরীত বাংলাদেশের আর্থিক খাত। ছুটি লম্বা হলে ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাওনা অর্থ আদায় করতে পারবে কিনা  এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত খেলাপি ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ।  আবার আমানত ও ঋণের সুদের হার ৬/৯ শতাংশ হওয়ার ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, অপেক্ষাকৃত নতুন,  ছোট ব্যাংক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল  আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তীব্র হতে পারে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি কর্মী ছাঁটাইয়ের তথ্য না পাওয়া গেলেও কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ছুটি বেশি লম্বা হয়ে গেলে ছুটি শেষে কি ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় সেটাই দেখার বিষয়।

আশার কথা হল সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যা দেশের অভ্যন্তরীণ দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৫২ শতাংশ। উক্ত প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য সরকারি ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং অর্থের জোগান বৃদ্ধি করা। যে উদ্দেশে উক্ত কর্মসূচী তা বাস্তবায়ন সফল হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আসন্ন মন্দা কিংবা মহামন্দা থেকে অনেকটাই রক্ষা পেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সফলতা নির্ভর করছে প্রণোদনা প্যাকেজের সঠিক ও পরিকল্পিত বাস্তবায়নের উপর।

ইমেইল: ma_masum@yahoo.com

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41