ঢাকা বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ২১, ২০২১
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এক নক্ষত্র,উজ্জলতায় আলোকিত থাকুক
  • এম. এ. মাসুম
  • ২০২১-০১-০১ ২২:০৬:৪৯

গতকাল রাত বারটা বাজার আগেই আতশবাজির শব্দ শুনতে পেলাম। ঠিক বারটার সময় বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখি আকাশ ভরা আতশবাজির আলোর ঝলকানি, মনে হচ্ছে ঢাকার আকাশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। করোনার কারনে প্রায় সারা বছর অনেকটা গোমটভাবে কেটেছে। তাই বছর শেষে তরুণদের আনন্দ্ উল্লাশ দেখে ভালই লাগল।আতশবাজির মধ্যে আকাশে তারকা, নক্ষত্র কিংবা চাঁদের তেমন দেখা মিললনা। আসলে নগর আকাশটা এমনি হয়। গ্রামের রাতের আকাশ দেখলে মনটা ভরে যায়। বিশেষ করে সেটা যদি হয় পূর্ণিমার রাত। ঢাকা শহরে কখন পূণিমা আর অমবস্যা আসে কিছুই বুঝা যায়না।

বর্ষবরণের আকাশ দেখে মনে হয়েছিল নতুন বছরের অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং নিয়ে কিছু লিখি। যদিও এ ধরনের নিবন্ধ কয়েকটি পত্রিকায় ইতোমধ্যেই প্রকাশ হয়েছে, কয়েকটি লেখা প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। গককালই ইসলামী ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক শ্রদ্ধেয় মাহবুব উল আলম স্যার অবসর গ্রহণ করলেন। মাহবুব উল আলম স্যার শুধুমাত্র একজন ব্যাংকারই নন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি উজ্জল নক্ষত্রও বটে। তাই মনে হল এমন একজন ব্যক্তিত্বেকে নিয়ে আমার একটি লেখাও থাকবেনা তা কি করে হয়। 

মাহবুব উল আলম স্যারের সাথে আমার সরাসরি কাজ করার অথবা অন্য কোনভাবেই অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠার সুযোগ হয়নি। কিন্তু একজন সাধারন পথিক হিসাবে বিশাল বট বৃক্ষের ছায়ার স্বাদ আশ্বাদন করতে পেরেও নিজেকে ধন্য মনে করছি।

গতকাল ৩১ ডিসেম্বর স্যারের সর্বশেষ কর্মদিবস এবং বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এমন বিশাল আয়োজন ইসলামী ব্যাংকের ২০ হাজার জনসংখ্যার পরিবার এর আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি বলে আমার মনে হয়। ঢাকার বাইরের উর্ধতন নির্বাহীবৃন্দ ভার্চুয়ালে আলোচনা অংশ গ্রহণ করেন। সরাসরি এবং ভাচূয়ালে ব্যাংকের অধিকাংশ সদস্য এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরাও বিদায় অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে অনুষ্ঠানটি অনেক বড় আকার ধারণ করে।

আসলে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহির মেয়াদ পূর্ণ করে প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নেয়া অনেক সময় ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের অনেক দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সিইও সবসময় সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিতে পারেননা। এইতো ক’দিন আগেই দেখলাম আমাদের দেশের সনামধন্য একটি বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের সিইও মেয়াদপূর্তির মাত্র একদিন আগে পদত্যাগ করে চলে গেলেন। এধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই ঘটতে দেখছি।

ইসলামী ব্যাংকেও পরপর দুই জন এমডি আনুষ্ঠিানিকভাবে বিদায় নিতে পারেননি। আসলে এধনের পদ অত্যন্ত স্পর্সকাতর। মালিকপক্ষ, পরিচালনা পর্ষদ, অধস্তন ব্যাংকার, গ্রাহক, সরকারী বেসরকারী এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের সাথে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীকে সমন্বয় করে পথ চলতে হয়। এসব পক্ষের সাথে মতপার্থক্য তৈরি হলে এ ধরনের পদ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে মাহবুব উল আলম স্যার একজন সফল এবং ভাগ্যবান নির্বাহী যিনি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করে সবার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা নিয়ে ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন।

তিনি শুধুমাত্র একজন সফল ব্যাংকারই নয়, একাধারে চিন্তাবিদ, উদ্দোক্তা গড়ার কারিগর, নতুন ধারনার উদ্ভাবক, নৈতিক ও মানবিকতা সম্পন্ন মহানায়ক, অধস্তনদের হৃদয়ের গভীরে স্থান পাওয়া অভিভাবক, আধুনিক ব্যাংকিংক সেবার উদ্ভাবক,গ্রাহকদের আস্থার জায়গা, সুবক্তা, সঠিক পথের প্রদর্শক, অর্থনৈতিক যুদ্ধের সাহসী সেনাপতি। আসলে এধরনের আরো অসংখ্য গুনাবলি তার নামের সাথে যোগ করা যেতে পারে।

তিনি সিইও হিসাবে যোগদান করেই বলেছিলেন, এ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যাংকের মুনাফা নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা, তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমানত সংগ্রহ করার পদ্ধতি সমর্থন করতেননা। তিনি তার সহকর্মীদেরকে ব্যাংকিং নিয়ম কানুন ও নীতি নৈতিকতা কঠোরভাবে পরিপালন করে ব্যাংকে টেকসই ভিত্তির উপর দাঁড় করার জন্য পরামর্শ দেন। তিনি মনে করেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করে গ্রাহক সংগ্রহ করলে তা স্থায়ী হয়না। কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি হলে বা অন্য কোন কারনেও গ্রাহক চলে যেতে পারেন। তাই ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়েও সামগ্রিক ব্যাংকিংকে আধুনিক তথ্য প্রযু্ক্তি সম্পন্ন করে গ্রাহক বান্ধব করা হলে গ্রাহকরা এমনিতেই ব্যাংকে ভিড়বেন। তিনি চেষ্টা করেছেন ব্যাংকে বিশ্বমানের প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন ও সেবার মান আধুনিকায়ন করা। তার ধারণা শতভাগ সফলতা পেয়েছে। ইতোমধ্যেই ব্যাংক কোটি গ্রাহক অতিক্রম করেছে,আমানত লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। রেমিট্যান্সে দেশের মোট ব্যাংকিংয়ের ৩০ শতাংশের বেশী ইসলামী ব্যাংক একাই আহরণ করছে। আমদানি রপ্তানিতেও দেশের শীর্ষ স্থানে অবস্থান করছে।তিনি ব্যাংকের শিকড় গভীরে পৌছে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যান্য ব্যাংক থেকে একটু বিলম্বে এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করলেও ইতোমধ্যে তা ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে।এজেন্ট ব্যাংকিং এবং উপ-শাখা এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে গেছে এবং ব্যাবসার পরিধি অন্যান্য ব্যাংক থেকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক বাণিজ্যে পরিচালনায় নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি মাত্র নস্ট্রো হিসাব ছিল যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি নস্ট্রো ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আরো বৃদ্ধির অপেক্ষায় আছে।

তিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে, গড়েছে পুস্প বাগান। তিনি তার কর্মী বাহিনীর অন্তরঙ্গ ও মানবিক বন্ধু হতে পেরেছিলেন। ব্যাংকের কর্মীদের পদোন্নতির একটি বিশাল জট তৈরি হয়েছিল। তিনি সফলভাবে সেই জট খুলে অনেকটাই নিয়মিত করেতে সক্ষম হয়েছেন।আমরা জেনেছিলাম, কর্মীদের জন্য বেতন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছেলেন কিন্তু মহামারির থাবায় তার আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মধ্যে এটিও ব্যর্থ হয়।

তিনি শুধুমাত্র ব্যাংকিং গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,ব্যাংক পরিবারে সামাজিক চর্চার প্রতিও মনোযোগী ছিলেন। ব্যাংকারদের ছেলেমেয়েদের সুস্থ ধারার বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও খেলাধুলার প্রতিও তিনি খেয়াল রাখতেন। ব্যাংকের অভ্যন্তরেও মানসম্পন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতি তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। 

মহামারি শুরুর পর থেকেই অনেক ব্যাংকে বেতন হ্রাস ও কর্মী ছাঁটাই আতঙ্ক থাকলেও ইসলামী ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে তেমন আতঙ্ক তৈরি হয়নি। কারণ সবার আস্থা ছিল বটবৃক্ষের মত অভিভাবক এমডি স্যারের প্রতি। এ ব্যাংকের কর্মীরা এখন পর্যন্ত নিরাপদ আছেন। তিনি করোনায় আক্রান্ত প্রত্যেক সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে ফোনে যোগাযোগ রেখে তাদেরকে মনোবল যুগিয়েছেন। করোনায় আক্রান্ত ব্যাংকারদের চিকিৎসায় সহযোগিতার ব্যবস্থা করেছেন। প্রাত্যেক ঈদের সময় করোনায় আক্রান্ত সমস্ত সহকর্মীদের জন্য বিশেষ তোহফা বা উপহার সামগ্রি বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি বিভিন্ন সভা সেমিনারে বক্তৃতায়ও করোনা আক্রান্তদের সাহস যোগিয়েছেন। তিনি একটি বক্তৃতায় করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আপ্লুত এবং অশ্রুশিক্ত হয়ে পরেন যা ইসলামী ব্যাংক পরিবারের পত্যেক সদস্যদের হৃদয়কে আপ্লুত করেছে। তিনি যে একজন ইতিবাচক,নৈতিক ও মানবিক ব্যাংকার তা তার প্রতিটি আচার আচরণ ও আলোচানায় ফুটে উঠেছে। সংক্ষেপে বলব তিনি একজন সফল,ইতিবাচক ও মানবিক ব্যাংকার।

স্যারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আরেকজন বিশাল মনের মানুষ শ্রদ্ধেয় মোহাম্মাদ মনিরুল মাওলা। যিনি শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংকের নয় সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম সেরা ব্যাংকার। আমরা আশা করছি তিনি যেন বিদায়ী স্যারের মত সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং ব্যাংককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারেন। সেসাথে বিদায়ী স্যারের অসমাপ্ত দায়িত্ব যেন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারেন।

আপনাকে উপদেশ দেয়ার সক্ষমতা নেই তাই বিনীতভাবে অনুরোধ করব হয়ত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকে নিয়মিত ব্যাংকার হিসাবে বিদায় নিয়েছেন কিন্তু হারিয়ে যাবেননা। পৃথিবীর অনেক দেশের মেধাবী,সফল  ও তুখোড় রাষ্ট্রনায়ক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, বহুজাতিক কোম্পানীর শীর্ষ কর্তা, সরকারী বেসরকারী ব্যাংকের সিইও অবসরের পর কোথায় যেন হারিয়ে যান, অনেকে স্বেচ্ছায় নিজ গৃহে নির্বাসনে চলে যান। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতিরাও অবসরের পর তাদেরকে আর তেমন জনসম্মুখে কোন কর্মকান্ডে দেখা যায় নাই। আবার অনেকেই আছেন যারা অবসরের পরও মাঠে মায়দানে স্বতন্ত্রভাবে দাপিয়ে বেড়ান। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পর নিরব হয়ে গেছেন কিন্তু বিল ক্লিনটওন ও তার স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠনদান, সভা সেমিনারে অংশগ্রহণ সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব আছেন। ভারতের অনেক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকাররা নিয়মিত বিভিন্ন ব্যাংকিং ইস্যুতে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত রাখছেন। বাংলাদেশেও কিছু সংখ্যাক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও আমলা যেমন সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ,ড.আতিউর রাহমান, ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, বিদেশী ব্যাংকের সিইও মামুন রশিদ, এনবিআর এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, ইসলামী ব্যাংকের প্রথম এমডি প্রয়াত  আজিজুল হক সহ আরো অনেক প্রতিথযষা ব্যাক্তিত্ব যারা ব্যাংকিং ও অর্থনীতির সাথে সারাজীবন বিভিন্নভাবে নিকেকে ব্যস্ত রেখেছেন। তারা নিয়মিতভাবে লেখালেখি, গণমাধ্যম সহ সভা সিম্পোজিয়ামে অংশ গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব আছেন। 

আরো দীর্ঘদিন আপনার নিবিড় সান্নিধ্য চাই অন্ততঃ আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য হলেও । বিশেষতঃ নবাগত তরুণ ব্যাংকারদের জন্য। আমরা চাই আপনি ব্যাংকিং বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতির সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে নিবিড় ভাবে সম্পৃক্ত থাকুন এবং আগামী দিনের ব্যাংকিং উন্নয়নে আপনার অবদান অব্যাহত থাকুক।

ভাল থাকুন স্যার, আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আপনি থাকুন ব্যাংকিং ও অর্থনীতির অঙ্গনে, দ্রুব তারা হয়ে এ ব্যাংকিং পরিবারের সাথে। সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা।

লেখকঃ সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ

ফরেন ট্রেড প্রসেসিং ডিভিশন, প্রধান কার্যালয়।

ইমেইলঃ ma_masum@yahoo.com

 

ব্যাংক এশিয়া মানেই ভালো কিছুর সাথে যুক্ত হওয়া: প্রসঙ্গ এজেন্ট ব্যাংকিং
ব্যাংকারদের ভাবনায় ২০২১ সন
দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার ১৭% ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক !