ঢাকা মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২৬, ২০২১
রিজার্ভ থেকে ঋণ নিতে চায় বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তারা
  • ব্যাংকবীমাবিডি
  • ২০২১-০১-০৮ ০৯:৩৯:০৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ঋণ নিয়ে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে চান ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার বা আইপিপি খাতের বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে পুরোনো কেন্দ্রের জন্য যে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, তাও শোধ করতে চান রিজার্ভের ঋণে। রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের মধ্যে এমন দাবি তুলেছেন বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তারা।

গত সোমবার এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)। এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়েও একই চিঠি দেয় সংগঠনটি। যদিও সরকার জানিয়ে দিয়েছে, শুধু সরকারি প্রকল্পের জন্য রিজার্ভের ঋণ ব্যবহার করা যাবে। এ নিয়ে নীতিমালা তৈরি করছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিআইপিপিএর চিঠিতে বলা হয়, রিজার্ভ থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে বিদ্যুৎ খাত অগ্রাধিকার পাবে। এ জন্য তারা বেশ কিছু যুক্তিও তুলে ধরেছে। সংগঠনটি বলছে, এই খাতের সব আইপিপি প্রকল্প সার্বভৌম গ্যারান্টি পায়। এ খাতের আয় বৈদেশিক মুদ্রায় হয়, আবার বিদেশ থেকে ঋণও নেয়। বর্তমানে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ রয়েছে। যদি রিজার্ভ থেকে ঋণ পাওয়া যায়, তাহলে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। কারণ, বিদেশি ঋণে সুদহার ৬ শতাংশ। আবার রিজার্ভ থেকে ঋণ দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশে টাকা রাখার চেয়ে বেশি মুনাফা পাবে। এদিকে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প আসছে। এ জন্য আরও ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ প্রয়োজন হবে। এই ঋণও রিজার্ভ থেকে দেওয়ার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।

জানতে চাইলে বিআইপিপিএর সভাপতি ইমরান করিম বলেন, ‘সরকার রিজার্ভ থেকে ঋণ দিতে চায়। তাই এই ঋণে আমরা অগ্রাধিকার চাই। কারণ, বিদ্যুৎ খাত অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। আমাদের প্রকল্পে সার্বভৌম গ্যারান্টি থাকে। আশা করি, রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়া হলে বিদ্যুৎ খাত আগে এই ঋণ পাবে।’

তবে অর্থনীতিবিদেরা রিজার্ভ থেকে ঋণ দেওয়ার বিপক্ষে। তাঁরা বলছেন, রিজার্ভ হলো দুঃসময়ের সঙ্গী। আবার ঋণ পরিশোধে উত্তম চর্চাসম্পন্ন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম। ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃ তফসিল করেনি, এমন প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে।

রিজার্ভের অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা নিয়ে পাঁচ বছর ধরেই আলোচনা চলছে। নতুন করে আলোচনাটি শুরু হয় গত ৬ জুলাইয়ের পর। সেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সরকারি খাতের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে সরকারকে ঋণের নিশ্চয়তা দানকারী (গ্যারান্টার) হতে হবে। তবে এখনই সরকারি প্রকল্পের বাইরে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের পক্ষে না অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংগঠনটির দাবি, বিদেশী উৎস থেকে যেসব ঋণ নেয়া হচ্ছে, তার সুদহার প্রায় ৬ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে যদি ৩-৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া হয়, তাহলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক বেশি মুনাফা পাবে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আইপিপি খাতের বিদ্যুৎ প্রকল্প আসছে। এজন্য আরো ২-৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রয়োজন হবে। এ অর্থও রিজার্ভ থেকে জোগান দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান করিম বলেন, রিজার্ভের অর্থ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ড মার্কেটে বিনিয়োগ করে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বন্ডের সুদহার কম থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদেশী বিভিন্ন উৎস থেকে এরই মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে। এ ঋণের জন্য ৬ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে দিন শেষে দেশের অর্থই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইমরান করিমের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি রিজার্ভ থেকে বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে ৩-৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক উপকৃত হবে। পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও রোধ হবে।

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা ফেরত দিচ্ছেন না। এখন রিজার্ভ থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ইমরান করিম বলেন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা যাতে ঋণ নিতে না পারেন তার জন্য উদ্যোগ নেয়া দরকার। রিজার্ভ থেকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ঋণ বিতরণকারী ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হতে পারে। বিপিডিবির কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে উদ্যোক্তারা যে অর্থ পাবেন, তা ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। সে অর্থ থেকে ঋণ সমন্বয়ের পর তবেই উদ্যোক্তাদের হিসাবে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলে খেলাপি হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তবে এখনই বেসরকারি খাতে রিজার্ভ থেকে ঋণ দেয়ার বিপক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রিজার্ভ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে এরই মধ্যে ঋণ দেয়া হয়েছে। তবে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। রিজার্ভ থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পূর্বানুমোদন লাগবে। পর্ষদ অনুমোদন দিলে এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে রিজার্ভ থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তাগাদা এলে সেটি ভিন্ন কথা।

দেশে ঋণখেলাপি ৩ লাখ ৩৫ হাজার জন
মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ২৩৪২৫ টাকা
আপাতত হচ্ছে না বাণিজ্য মেলা