রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ০২:০০ পূর্বাহ্ন

ব্যাংক পরিচালনায় উদ্যোক্তা পরিচালক কমিয়ে স্বতন্ত্র বাড়ানোর পরামর্শ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম সোমবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৮৫ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, ব্যাংক পরিচালনায় পর্ষদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। কমাতে হবে উদ্যোক্তা পরিচালকের সংখ্যা। এভাবে পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনতে হবে। একই সঙ্গে তারা খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা ও ঋণ নবায়নের নীতিমালা আরও কঠোর করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছে।

সম্প্রতি আইএমএফের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এটি তারা অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরির আগের ধাপ হিসাবে এটি তৈরি করেছে। এর ভিত্তিতে তারা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বেশির ভাগ ব্যাংকে পর্ষদের পরিচালক রয়েছেন ২০ জনের মতো। কোনো কোনো ব্যাংকে আরও বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় পরিচালকের সংখ্যা অনেক বেশি। স্বতন্ত্র ও আমানতকারীদের মধ্যে থেকে পরিচালক আছে মাত্র ৩ জন। ফলে একদিকে উদ্যোক্তা পরিচালক থাকছেন ২০ জন। অন্যদিকে থাকছেন স্বতন্ত্র ৩ পরিচালক। এতে স্বতন্ত্র পরিচালকরা ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পর্ষদে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। সুশাসন নিশ্চিতে ৩ স্বতন্ত্র পরিচালক, ২০ উদ্যোক্তা পরিচালককে মোকাবেলা করতে পারেন না। ফলে ব্যাংকের পর্ষদে একতরফাভাবে সবকিছু পাস হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকের সুশাসন ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে উদ্যোক্তা পরিচালকের সংখ্যা কমাতে হবে। বাড়াতে হবে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা নয়জনে সীমিত করা হয়েছিল। পরে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে এ সীমা তুলে দেয়া হয়। ফলে এখন পরিচালকের সংখ্যায় কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই সংখ্যা অবশ্যই কমানো উচিত। একই সঙ্গে আমানতকারীদের মধ্যে থেকে ও স্বতন্ত্র পরিচালক বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পরিচালক নিয়োগ দেয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, উদ্যোক্তা পরিচালক হতে গেলেও যোগ্যতার মাপকাঠি থাকা দরকার। বর্তমানে অনেকের স্ত্রী, সন্তান পরিচালক। যারা ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। ব্যাংকিং পেশায় অভিজ্ঞদেরই পরিচালক হওয়ার বিধান জরুরি। অন্যথায় পর্ষদের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা আসবে না।

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক খাত তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। তারা অনেক সময় ব্যাংক তদারকির ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যমেয়াদি কাঠামোতে আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে বহুমুখী দুর্বলতা। এ খাতে উচ্চ মাত্রায় খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ। ঝুঁকি নিরূপণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য সংগ্রহ করে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। তারা যথাযথ তথ্য পাঠায় না। এ কারণে ঝুঁকি নিরূপণেও সমস্যা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার মান আরও উন্নয়নের সুপারিশ করেছে আইএমএফ।

এতে আরও বলা হয়, আর্থিক খাতের সব পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সুপারভিশন করতে পারছে না। আইনি বাধা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন, ক্ষমতার প্রয়োগ, অনিয়মের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। ব্যাংকের শাখা পর্যায়ে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা থাকতে হবে। শক্তিশালী আর্থিক খাতের জন্য এসব ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছে আইএমএফ।

সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হয় ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২’ অনুযায়ী। ওই আইনে ব্যাংকের যেসব ক্ষমতা দেয়া আছে সেগুলো আরও বাড়ানো উচিত। সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অন্যান্য দেশের মতো ‘স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবেই ভাবা উচিত।

প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। তারা বলেছে, এর সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে। আন্তর্জাতিক মৌলিক নীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে তা করতে হবে। বর্তমানে প্রায় সব ধরনের ঋণখেলাপি হচ্ছে তিন মাসেরও বেশি সময় পর। এতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার কমে যাচ্ছে। তিন মাস পর খেলাপি হলে এর পরিমাণ আরও অনেক বেড়ে যেত।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চলমানের কিস্তি তিন মাস পর অপরিশোধিত থাকলে এবং মেয়াদি ঋণের কিস্তি ছয় মাস পর অপরিশোধিত থাকলে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নীতিমালায় পরিবর্তন এনে প্রতি ক্ষেত্রে তিন মাস বাড়িয়েছে। ফলে এখন চলমান ঋণ ছয় মাস পর ও মেয়াদি ঋণ নয় মাস পর খেলাপি হচ্ছে। এ নীতিমালার আলোকে বর্তমানে খেলাপি ঋণ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। রাইটঅফ, আদালতের আদেশে স্থগিত ও বিশেষ হিসাবসহ এর পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে মনে করছে টিআইবি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে ঘন ঘন ছাড় দেয়া যেমন উচিত নয়, তেমনি নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানের হওয়া বাঞ্ছনীয়।

খেলাপি ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দেয়া হয়েছে। কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে এ সুযোগ। সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যবস্থা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত। সরকারি ব্যাংকগুলো পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করতে হবে। সরকারিসহ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41