রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ন

শাহজালাল ব্যাংকে ছাঁটাই অতঙ্ক, বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০
  • ৭৫২২ বার পঠিত

ক্রমাগত চাপের মুখে আতঙ্কিত জীবনযাপন করছেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ব্যাংকটির ১৭০ কর্মকর্তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৪৫ কর্মকর্তার অফিসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। উপস্থিতির স্বয়ংক্রিয় মেশিন (বায়োমেট্রিক) থেকে নাম মুছে ফেলা হয়েছে তাদের। পাশাপাশি অফিশিয়াল কম্পিউটারগুলোয় আর লগ ইন করতে পারছেন না তারা। এই অবস্থায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় আতঙ্কিত জীবনযাপন করছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগপত্র জমা পড়েছে।

করোনা চলাকালে ব্যাংক কর্মীদের মনোযোগ বাড়াতে কর্মকর্তাদের জন্য প্রণোদনা ও স্বাস্থ্যবিমা চালুর নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এপ্রিল ও মে মাসে যারা শাখায় গিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারা এ সুবিধা পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়ে প্রথম থেকেই নিরুৎসাহিত করে আসছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু কিছু ব্যাংক ব্যয় সংকোচনের জন্য গোপনে কর্মী ছাঁটাই করেছে। কর্মীদের বেতন কমিয়েও ব্যয় সংকোচন করেছে কেউ কেউ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর পাঠানো ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যহারের মাধ্যমে নির্বাচিত কিছু কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা করছেন, যা করোনাকালীন এই সময়ের জন্য অমানবিক ও গর্হিত কাজ। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অনেকেই আছেন যারা আর মাত্র সাত থেকে আট বছর পর অবসরে যাবেন, তাদেরও চাকরি ছাড়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে। করোনার মধ্যে চাকরি হারালে আমরা খুবই বিপদে পড়ে যাব। তাই দ্রুততম সময়ে আমাদের বিষয়টি তদন্ত করে নিরীহ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে আমাদের পরিবার-পরিজনকে বাঁচানো হোক।’

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ‘বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই বিভিন্ন রকমের নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছেন। নিয়োগ দিয়েছেন পছন্দের লোকবল, যা এখন অতিরিক্ত হিসেবে চিহ্নিত। এই জনবল কাজে লাগানোর জন্যই পুরোনো কর্মীদের ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’ এখানে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘এসব অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের সময় কোনো নিয়ম-নীতি মানা হয়নি। ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট ছাড়াও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে অনভিজ্ঞ ও নন-ব্যাংকার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে বিক্রয় ডট কম, কন্ট্রাকচুয়াল ও গার্মেন্টের কমার্শিয়াল পর্যায়ে কাজ করা অনেক কর্মকর্তা।’

‘পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রেও নিয়ম-নীতি মানছে না কর্তৃপক্ষ। যেমন ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, যারা সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৭৫ শতাংশ আমানত সংগ্রহের টার্গেট অর্জন করবে, শুধু তাদের ইনক্রিমেন্ট ও বার্ষিক বোনাস প্রদান করা হবে। কিন্তু অনেক কর্মী টার্গেট ফিলআপ করেও বার্ষিক বোনাস ও ইনক্রিমেন্ট কিছুই পাননি। কেউ ১৫, কেউ ১৬, কেউ ১৭, কেউ ১৮ বছর সম্মানের সঙ্গে কাজ করে এসে হঠাৎ করে নন-পারফরমার বলে বিবেচিত হলাম। অথচ কেউ আগে কিছুই জানতে পারিনি।’

‘ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী একজন কর্মচারী তখনই নন-পারফরমার বলে বিবেচিত হবেন, যখন সেই কর্মচারী পরপর কয়েক বছর টার্গেট পূরণ করতে পারবেন না। কিন্তু বর্তমান কর্তৃপক্ষ একটি ছাঁটাই তালিকা করেছে, এতে অনেক নিরীহ কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদ্যমান আছেন। এরই মধ্যে দফায় দফায় ২০-৩০ কর্মীকে মানবসম্পদ বিভাগে ডেকে বলা হয়েছে, তারা যেন তিন মাসের নোটিস দিয়ে সাত দিনের মধ্যে রিজাইন করে অন্য জায়গায় চাকরির ব্যবস্থা করেন। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। জানুয়ারির পর তাদের বেতন বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে আরও বলা হয়েছে, ইচ্ছা করলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন, কিন্তু কোনো লাভ হবে না। সেই ক্ষেত্রে সার্ভিস বেনিফিট পাঁচ-ছয় বছর আটকিয়ে রাখবে ব্যাংক।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ডিএমডি ও মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান কামরুল হাসান চৌধুরি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা একেবারেই ভিত্তিহীন। কাউকেই চাকরি ছাড়ার চাপ দেওয়া হয়নি। তবে যেসব শাখা দীর্ঘদিন থেকে খারাপ পারফরম্যান্স দেখিয়ে আসছে, তাদের সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া অনেকেই চাকরি পরিবর্তন করে অন্য ব্যাংকে চলে গেছেন। বিভিন্ন ব্যাংক ইসলামিক উইন্ডো চালু করায় আমাদের ব্যাংকের কর্মকর্তাদের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মার্চ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত চাকরি পরিবর্তন করা এমন কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪০ জন।’

আইন অনুযায়ী, স্বেচ্ছায় কোনো কর্মকর্তা চাকরি ছাড়লে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির টাকা দিতে বাধ্য থাকে ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃক ছাঁটাই করা হলে অতিরিক্ত তিন মাসের বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির টাকা পরিশোধ করতে হয়। ব্যাংকাররা জানান, ছাঁটাই করলে আইনি ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা থাকে, সে কারণে কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছায় চাকারি ছাড়তে চাপ দেয় ব্যাংগুলো।

উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই বুধবার প্রায় ৮১ কর্মকর্তাকে ছাঁটাইয়ের কথা জানিয়ে একটি তালিকা করে এবি ব্যাংক। তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের ১২ জুলাই থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ব্যাংকের নিজস্ব নিয়মে তাদের পাওনা ও তিন মাসের মূল বেতন পরিশোধের ঘোষণা দেয় এবি ব্যাংক।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41