বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৭:০৯ অপরাহ্ন

ঋণখেলাপি নীতির শিথিলতা দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংক খাত আরো বিপর্যস্ত হতে পারে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৩৪২ বার পঠিত

এমনিতেই নাজুক অবস্থায় দেশের ব্যাংক খাত। এপ্রিল থেকে সরকারি নির্দেশে ঋণের সুদহার কমিয়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে।এর মধ্যে করোনা মহামারীর কারণে ব্যাবসায়ীদেরকে জন্য বিভিন্ন নীতির শিথিলতার কারণে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি আদায় না হওয়ায় আয় মারাত্নকভাবে হ্রাস পেয়েছে যা ব্যাংকারদের জন্য ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ র মত অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আমদানি-রপ্তানিসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের কারণে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলে অনেক ঋণগ্রহীতাই সময়মতো ঋণের অর্থ পরিশোধে সক্ষম হবেন না বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এতে চলমান ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এবং দেশে সামগ্রিক কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বাণিজ্য সচল রাখা এবং তাদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ঋণ পরিশোধের সময় সহ অন্যান্য নীততে ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলায় কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের ঋণখেলাপিদের বড় ছাড় দিয়েছে।

বর্তামানে পদ্ধতি চলমান বা বিতরণ করা ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসিত করার সময় বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে এসব ঋণখেলাপি হওয়ার পর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে বিভক্ত হওয়ার মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দেয়া হয়েছে ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখার হার।

আগের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ঋণ এক বছর পর্যন্ত অপরিশোধিত থাকলে তা মন্দ বা কুঋণে পরিণত হতো, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এখন হবে আড়াই বছর পর। অর্থাৎ দেড় বছর বাড়ানো হয়েছে। এভাবে খেলাপি ঋণের সব ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি পরিশোধের শেষ দিন থেকে ৬ মাস অতিক্রম হলেই তা নিম্নমান হিসেবে চিহ্নিত হতো। নয় মাসের কম সময় পর্যন্ত নিম্নমান হিসেবে বিবেচিত হতো। নতুন নিয়মে কিস্তি পরিশোধের ৬ মাস থেকে ১৮ মাসের কম বা দেড় বছরের কম সময় পর্যন্ত নিম্নমান হিসেবে চিহ্নিত হবে। এ খাতে সময় সীমা বাড়ল ৯ মাস। নিম্নমান ঋণের বিপরীতে আগে প্রভিশনের হার ছিল ২০ শতাংশ। এখন তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ খাতে প্রভিশনের হার কমল ১৫ শতাংশ।

আগের নিয়মে কোনো চলমান ঋণ বা এর কোনো কিস্তি পরিশোধের ৯ মাস থেকে ১২ মাসের কম সময় পর্যন্ত খেলাপি হিসাবে থাকলে তা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হতো। এখন ১৮ মাসের বেশি থেকে ৩০ মাসের কম বা আড়াই বছরের কম সময় পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে থাকলে তা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হবে। সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে আগে প্রভিশনের হার ছিল ৫০ শতাংশ। এখন তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। ছাড় দেয়া হয়েছে ৩০ শতাংশ।

আগের নীতিমালায় কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি এক বছর থেকে দেড় বছর পর্যন্ত অপরিশোধিত থাকলে তা মন্দ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসিত হতো। এখন কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি ৩০ মাসের বেশি বা আড়াই বছরের বেশি খেলাপি হিসেবে থাকলে তা মন্দ বা কুঋণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। কুঋণের বিপরীতে আগে প্রভিশনের হার ছিল শতভাগ। নতুন নিয়মেও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমবার ঘোষণা করে আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। এর ফলে বর্তমানে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁকে খেলাপি করা যাবে না। পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীদের পরামর্শে দ্বিতীয়বার আরো তিন মাস বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে শিথিলতার সুযোগ দেয়া হয়। অর্থাৎ গত ১ জানুয়ারি ঋণের শ্রেণিমান যা ছিল, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই মানেই রাখতে হবে, এর চেয়ে বিরূপ মানে শ্রেণীকরণ করা যাবে না।

জানা যায়, ব্যবসায়ীদের অনুরোধে ঋণখেলাপি নীতিমালা শিথিলতার সময়সীমা আরো তিন মাস বাড়ানো হতে পারে।সরকারেএতে সম্মতি দিলে আগামী ডিসেম্বর মাস ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপি হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন গ্রহীতারা। এর ফলে টানা এক বছর ঋণ পরিশোধ না করার সুযোগ মিলতে পারে।

ঋণখেলাপি নীতির শিথিলতার ফলে বিশেষ করে বেসরকারী ব্যাংকগুলোয় নেতিবাচক প্রভাবই প্রকট আকার ধারণ করছে। ব্যাংকাররা বলছে, যারা ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম তারাও পরিশোধ করছেন না। এতে গ্রাহকের ঋণ কমছে না বরং সুদে আসলে তা বেড়ে যাচ্ছে। আবারো তিন মাস সময় দেয়া হলে টানা এক বছর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ হবে না। জানুয়ারিতে ওই মাসসহ ১০ থেকে ১২টি ঋণের কিস্তি এক সাথে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই তা পারবেন না। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ করেই কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এতে শুধু ব্যাংকিং খাতেই বিপর্যয় নেমে আসবে না, পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দীর্ঘ দিন ধরে ঋণের কিস্তি আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। নতুন করে ঋণ বিতরণ করা যাচ্ছে না। এক দিকে ব্যাংকের আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে, সেই সাথে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেয়ারও সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে সময় বাড়ানো হবে ব্যাংকিং খাতের জন্য আত্মঘাতী। কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী জানান, সময় বাড়ানোর আগে অবশ্যই ব্যাংকারদের মতামত নেয়া উচিত। কারণ, ব্যাংকাররা জানেন, প্রকৃতপক্ষে কারা ক্ষতিগ্রস্ত। কাদের ঋণ ফেরত দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির স্বার্থে ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না।

কিছু ব্যাংকাররা ইতিবাচক ‍দিক তুলে ধরে বলেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখার দাবি পূরণ করা হলে ব্যাংকগুলোর চাপ কমবে। ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতারা এর সুফল পাবেন। মহামারীতে বিপর্যস্ত ব্যবসায়িক পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা কমলেও নিট মুনাফা বাড়বে।

বাস্তবতা হলো খেলাপি আদায় যত দীর্ঘায়ীত হবে ততই বেসকারী ব্যাংকগুলোর চাপ বাড়বে। এর মধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। গত জুন প্রান্তিকে অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ঋণাত্মক ছিল। টিকে থাকার জন্য অনেক ব্যাংক কর্মকর্তাদের বেতন ভাতা হ্রাস করেছে এমনকি ছাঁটাইও হয়েছেন অনেক ব্যাংকার। ঋণ আদায় সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হলে বেসরকারী ব্যাংকগুলো মারাত্নক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে পারে।

ব্যাংকাররা মনে করেন, সময় বাড়ানোর আগে অবশ্যই ব্যাংকারদের মতামত নেয়া উচিত। কারণ, ব্যাংকাররা জানেন, প্রকৃতপক্ষে কারা ক্ষতিগ্রস্ত। কাদের ঋণ ফেরত দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির স্বার্থে ঢালাওভাবে শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের সুযোগ না দিয়ে ব্যাংকারদের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41