বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৬:৪৮ অপরাহ্ন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসহায়ত্ব এবং খেলাপি ঋণের রকেট গতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৩৪৪ বার পঠিত

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতেই চলেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি গোটা অর্থনীতির জন্য মোটেও সুখকর নয়। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে এথা স্বীকার না করে উপায় নেই। সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক ধরনের শঙ্কাভাব সৃষ্টি হয়েছে এর ফলে। আদায়যোগ্য খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টিও বেশ উদ্বেগজনক। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা সমস্যা উপলব্ধি করতে পারলেও সমাধানের ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেনা। শুধু তাই নয় এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকায় অনেকটা অসহায়ত্ব ফুটে উঠছে।

অভিযোগ পাওয়া যায়, শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপাটে উজাড় হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকের ভান্ডার। ক্ষমতাশীন দলের এক শ্রেণীর ডাকসাইটে প্রভাবশালীরা দলীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে ঋনের নামে ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছেন। অনেকে আবার যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিচ্ছেন সেগুলোকে লোকসানি দেখিয়ে ভিন্ন নামে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন।

সম্প্রতি দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)র এক গবেষণায প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯-২০১১ সাল পর্যন্ত খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও পরবর্তী সময়ে খেলাপি ঋণের হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৯ সালের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে বৃদ্ধি ৪১৭ শতাংশ। এ সময়ে প্রতিবছর গড়ে ৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে টিআইবি বলছে, ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা; এর সঙ্গে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ ৫৪ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ হ্রাসে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় না আনায় দিন দিন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। প্রতিবছর গড়ে ৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। গত ১০ বছরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪১৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

সংস্থাটি বলেছে, দেশের এখন সাতজন শীর্ষ গ্রহীতা ঋণ খেলাপি হলে ৩৫টি ব্যাংক এবং ১০ জন খেলাপি হলে ৩৭টি ব্যাংক মূলধন সংকটে পড়বে। গবেষণা অনুযায়ী, হাতেগোনা কয়েকজনের কাছেই রয়েছে বড় অংকের ঋণের টাকা। একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে কৌশলে বা যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। সংস্থাটির গবেষণায় পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসাবে বর্ননা করে এজন্য সিণ্ডিকেট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ব্যবসায়িক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কাজে অনিয়ম-দুর্নীতিকে অন্যতম কারণ হিসাবে তুলে ধরেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম-জালিয়াতি অনেক দিন ধরে চলছে। ব্যাংকিং নিয়মনীতি না মেনে বিভিন্ন মহলের নির্দেশ অনুযায়ী ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এতে ঋণখেলাপি বাড়ছে। ব্যাংকিং আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনা উপেক্ষা করেও ঋণ বিতরণের ঘটনা ঘটছে অহরহ।

অর্থনীতিবিদদের মতে,বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা গেলে ব্যাংক খাতের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও নির্দেশিত হয়ে ঋণ না দিলে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি আর খারাপ হবে না। তাহলেই ব্যাংক খাত আগের মতো ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করায় ব্যাংক খাত ঠিক করার প্রধান শর্ত।

ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো ও তাদের পদে থাকার মেয়াদও বাড়ানোর ব্যবস্থাটি একেবারেই ঠিক হয়নি। এর মাধ্যমে ব্যাংক খাত উল্টো পথে যাত্রা করেছে। সংস্কারের পরিবর্তে আরও সমস্যা বাড়ানো হয়েছে। এসব সুবিধা বাতিল করে আইনটিকে যুগোপযোগী করা দরকার। প্রয়োজন হলে আপাতত অধ্যাদেশের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে এসব সুবিধা বাতিল করতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে আইনে যে সমস্যা আছে, তার সব কটিই এখন বাতিল করা প্রয়োজন।

টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কথা উল্লেখ করে বলেছে, একটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে একক ঋণের বৃহত্তম ঋণসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ২০০৭ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সংঘটিত হলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপক প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকলেও পরে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হন। পরে ২০২০ সালে জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটিত হলে তাঁকে অপসারণের সুপারিশ করা হয়।

দেশের বরেণ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটু ভেবেচিন্তে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে দেওয়া প্রয়োজন। পেশাদারত্ব দেখে এসব পদে দায়িত্ব দিতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, এটাও একটা বড় সমস্যা। এ কারণে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপও করতে পারছে না। বেসিক ব্যাংকের কোনো উন্নতি হচ্ছে না, জনতা ব্যাংকের অবস্থাও দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ব্যবসায়ীরা জোর করে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। এসব বন্ধ করতে হবে। কেস-টু-কেস ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভালো ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে হবে। যেভাবে ২ শতাংশ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা ঠিক হয়নি। এখন আবার খুব সহজে ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঋণখেলাপির সংস্কৃতি চলতেই থাকবে। তখন খেলাপিরাই হর্তাকর্তা হয়ে উঠবেন।

ব্যাংক খাতের সার্বিক উন্নয়নে স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠনের কথা অনেক দিন ধরে শুনা যাচ্ছে। তবে সরকার এদিকে নজর দেবে বলে মনে হয় না। সরকার যদি বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোতে হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে আর ঋণখেলাপিদের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন উঠবে না। সরকার যখন হস্তক্ষেপ করে, দুষ্টচক্র তখন সুযোগ নেয়। রাজনৈতিকভাবে যদি ঘোষণা দেওয়া হয়, ব্যাংক খাতে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাহলে সবাই সতর্ক হয়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41