বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

ব্যাংকে বেতন হ্রাস বা ছাঁটাইয়ের মতো সনাতনী পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন মানসিকতার আধুনিকায়ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২০
  • ৮৬০ বার পঠিত

এম. এ. মাসুম

করোনাকালে ব্যাংকিং নিয়ে নানা রকম চ্যালেঞ্জের কথা আলোচনা হচ্ছে। করোনা-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাংকগুলো চিন্তিত। এ বছরের অর্ধবার্ষিক হিসাব সমাপনীর লাভ-লোকসানের খতিয়ান বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে পারে। করোনা সামনে নতুন কী প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা অনেকটাই অস্পষ্ট। কিছু ব্যাংক নিজস্ব বিবেচনায় বেতন-ভাতা হ্রাস কিংবা জনবল ছাঁটাইয়ের মতো খরচ কমানোর কিছু সনাতনী পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এর ফলে ব্যাংক কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে উৎসাহ হারায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বিরত থাকা উচিত। কর্মীদের মনোবল একটি ব্যাংকের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। এই করোনা মহামারির সময় তাদের ওপর চাপ পড়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া কোনভাবেই সমিচীন নয়।

ব্যাংকিং সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সনাতনী ব্যাংকিংকে গতকালের গল্প হিসেবে ভেবে রূপান্তর বা পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় এসেছে। বিশ্বে ব্যাংকিং খাতে চলছে পরিবর্তন আর রূপান্তরের হাওয়া। সম্প্রতি টেক জায়ান্ট গুগল জার্মানির ডয়েচ ব্যাংকের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। গ্রাহক সেবা এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংকিংকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা এবং ফিনটেকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং ক্লাউড ব্যাংকিংয়ে পদার্পণের জন্য এ উদ্যোগ।

অনেকে দেশের ব্যাংকিং নীতিকাঠামো সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন; কিন্তু ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, পরিবর্তন, রূপান্তর এবং দক্ষতা বৃদ্ধি কতটা প্রয়োজনীয় ও জরুরি সেই বিষয়টি আলোচনায় কম আসছে। অনেকে বলে থাকেন, দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করা একই ধাঁচের পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন বা রূপান্তর খুবই জটিল কাজ। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে তিন থেকে চার দশকের পুরনো কিছু ব্যাংক গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে বেশকিছু অভিনবত্ব আনার চেষ্টা করেছে।

পুরনো কর্মীদের ছাঁটাই বা সাইড লাইনে রেখে, ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করে, বাইরে থেকে নতুন কর্মী এনে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে; কিন্তু তারা দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারছে না। তাদেরও সংকট মোকাবেলায় বেতনভাতা হ্রাস কিংবা কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো সহজ পথে হাঁটতে হচ্ছে; কিন্তু শীর্ষপদে পরিবর্তন কিংবা কিছু কর্মী অন্য ব্যাংক থেকে উচ্চ বেতনে এনে বসিয়ে দিয়ে ব্যাংকের অবস্থা পরিবর্তনের প্রচলিত ধারণার মূলায়ন করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক একটি সনাতনী ব্যাংক থেকে যেভাবে রূপান্তরের মাধ্যমে এশিয়ার একটি অন্যতম সেরা ব্যাংকে পরিণত হল তার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে এর পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে মূল স্রোতকে দক্ষ করা, তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করা, নতুন কিছু করার স্বাধীনতা দেয়া, তাদের শেখানো, নিজে থেকে শেখার সুযোগ করে দেয়া, তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়িত সংযোগ রাখা এবং এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে ব্যাংকারদের কম ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায়। ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী পিযুষগুপ্ত ব্যাংকটিকে যখন গ্রাহক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এবং চীনা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যের কথা ভেবে এবং তাদের দিকে নজর রেখে, ব্যাংকটিকে ফিনটেকে রূপান্তরের দিকে নিয়ে গেলেন তখন তিনি কিন্তু মূল স্রোতকেই সামনে রাখলেন, তাদের দক্ষ করলেন, মানসিকতার পরিবর্তন করলেন, তাদের নিজে থেকে শেখার সুযোগ করে দিলেন এবং কম ঝুঁকিমুক্ত রাখার ব্যবস্থা করলেন। কেবল তিনি কয়েকজন ডাটা অ্যানালিস্ট নিয়োগ দিলেন। তিনি সিটি ব্যাংক এনএ থেকে এসে এ ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়ে নিজ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ডিবিএস ব্যাংকের ২৬০০০ কর্মীর মাইন্ডসেট পরিবর্তন ও দক্ষ করে রূপান্তরের উপযুক্ত করে নেয়ার প্রচেষ্টায় নামলেন এবং সফল হলেন।

করোনা মহামারির কারণে ভারতসহ বিশ্বজুড়ে যখন কর্মী ছাঁটাই চলছে, তখন এর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান ইমেরিটাস রতন টাটা। নিউজ ওয়েবসাইট ইওরস্টোরিকে দেওয়া এক সাক্ষৎকারে এই ব্যবসায়ী আইকন বলেন, ‘ভারতের কম্পানিগুলো ব্যয় সংকোচনের নামে যে উপায়ে কর্মী ছাঁটাই করছে তা কোনো সমাধানের পথ নয়।’

তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে এ প্রতিক্রিয়া বিবেকপ্রসূত বলে আমি মনে করি না। এ ছাঁটাই প্রমাণ করছে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমবেদনার ঘাটতি রয়েছে। আপনি যাদের ছাঁটাই করছেন, এরাই আপনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, নিজেদের পুরো ক্যারিয়ার আপনার কম্পানির পেছনে দিয়েছে। অথচ আপনি তাদের ঝড়ের কবলে ছেড়ে দিচ্ছেন।’ ‘আপনি যখন কর্মীদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন তখন এটি ব্যবসার কোন নীতির মধ্যে পড়ে?’ প্রশ্ন রাখেন রতন টাটা।

করোনা মহামারিতে আর্থিক সংকটের কারণ দেখিয়ে ভারতের অনেক কম্পানি কর্মী ছাঁটাই করলেও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান টাটা গ্রুপ কোনো কর্মী ছাঁটাই করেনি। এর বিপরীতে তারা শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বেতন সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। বিমান সংস্থা থেকে শুরু করে হোটেল, আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং গাড়ি ব্যবসাসহ টাটা গ্রুপের অনেক কম্পানিই করোনার মাঝে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। কিন্তু একজন কর্মীও তারা ছাঁটাই করেনি।

রতন টাটা বলেন, ‘একটি কম্পানির পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব, যদি নিজের কর্মীদের প্রতি সংবেদশীল না হয়। আপনি যদি ব্যয় সংকোচন করতেই চান তবে যেভাবে ন্যায্য, ভালো ও সুবিধাজনক হবে সেভাবে করবেন। ব্যবসা মানে শুধু টাকা বানানো নয়, আপনাকে নৈতিকভাবে যেটি সঠিক সেটিই করতে হবে; যা গ্রাহক ও স্টেকহোল্ডারদের প্রতি অন্যায্য হবে না।’

লেখকঃ ব্যাংক কর্মকর্তা

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41