বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১১:০৪ অপরাহ্ন

করোনাকালে ব্যাংকিং : উভয়সঙ্কটে ব্যাংকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম বুধবার, ১০ জুন, ২০২০
  • ১৯৬৪ বার পঠিত

মো: মোসলেহ উদ্দিন

দু’মাস ছ’দিনের টানা সাধারণ ছুটির পর দেশে সতর্কতার সাথে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ দেখে একজন ব্যাংকার হিসেবে আমার স্বস্তিই লাগছিলো। কারণ দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষনা দিয়ে লোকজনদের ঘরে আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টার ফলস্বরূপ মানুষের সোৎসাহে বাইরে আসার ধাক্কা সামলাতে সামলাতে ব্যাংকারমাত্রই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত এবং বিরক্ত হয়ে পড়ছিল। সংক্ষিপ্ত সময়ে সীমিত জনবল দিয়ে ব্যাংকিং সেবা দেয়াটা যে কতটা দূরহ ব্যাপার সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া কারো বুঝার কথা নয়।

শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ছিল, ন্যূনতম জনশক্তি দিয়ে জুরুরী ক্যাশ সেবা চালু রাখা। সেময় সঙ্গত কারণে খুব জরুরী নয় এমন অনেক সেবা বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মনোভাব কখনোই ইতিবাচক দেখা যায়নি। তাদের অনেকের কাছে স্বশরীরে ব্যাংকে এসে ব্যালেন্স জানা, ডিপিএস এর টাকা জমা দেয়া কিংবা হাতের টাকা ব্যাংকে নিজ হিসাবে জমা করার জন্য ব্যাংকে আসতে দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টাও এক প্রকার যুদ্ধেরই নামান্তর হয়ে উঠে। আপনি সেবা দানকালে শাখাভ্যন্তরে সামাজিক দূরত্ব মানাতে গেটের বাইরে গ্রাহক আটকাবেন, এটা তো গ্রাহক মানতে নারাজ। কারণ আর কোথাও না হোক গ্রাহকমাত্রই ব্যাংকে এসে আক্ষরিক অর্থেই নিজেদের কিং মনে করেন। (ব্যাংকিং শাস্ত্র জ্ঞানেও এমনটি বলা হয়েছে)।

গ্রাহকবহুল যেকোনো ব্যাংকের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে সেবা দিতে হলে বাইরের গেটে গ্রাহকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া সম্ভব নয়। আগে যারা প্রবেশ করেছেন তাদের যে অংশ বের হবে শুধু সে পরিমাণ লোকই পরবর্তি পর্যায়ে প্রবেশ করলে ভেতরে এবং বাইরের পরিবেশে নিরাপদ ভারসাম্যপূর্ণ থাকে। তবে এক্ষত্রে প্রথমে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা নিয়েই বাধে বিপত্তি। আগে যারা প্রবেশ তারা বের হলেই পরবর্তি ধাপে সমপরিমাণ লোক প্রবেশ করলে কোনো সমস্যা থাকার কথা না। কিন্তু সেটা হতে দিতেই নারাজ বাইরে অপেক্ষারত গ্রাহকগণ। যতোই লাইনে দাঁড়ানো এবং সেমতে প্রবেশ করার অনুরোধ করা হবে ততোই যেন তারা বেশি লাইন ভাঙ্গবেন এবং ভেতরের লোক বাইরে বেরুবার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে গলা হাঁকিয়ে চিৎকার করে বলবেন “গেট লাগিয়েছেন কেন ?”

আবার গেট খুলে যেই সীমিত সংখ্যক লোককে প্রবেশ করতে বলা হবে তখনই সবাই হুড়মুড় এবং ঠেলাঠেলি করে ভেতরে ঢুকতে থাকবেন। তখন গেট নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় কিছু থাকে না। আর প্রবেশকারিদের তাপমাত্রা মাপার জন্য থার্মাল স্ক্যানারের ব্যবহার এবং হাতে লাগাবার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজারের লাগাবারও সুযোগ থাকে না। এই ঠেলাঠেলি এবং নিয়ম ভাঙ্গাদের দলে দলে পুরুষরা যেমন নারীও তেমন। আবার গ্রামের মানুষ যেমন শহরের মানুষও তেমন। এমনকি অশিক্ষিতরা যেমন শিক্ষিতরাও তেমন।

এই তো গেল গেটের বাইরে এবং প্রবেশকালিন অবস্থা। ভেতরের অবস্থটা একই কারণে আরো শোচনীয়। এখানেও যতটা সুযোগ আছে ততটা নিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করতে কাউকে দেখা যায় না। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমি নিজে বারবার চেষ্টা করেও হতাশ হয়ে পড়ছি দিন দিন। যেখানে সুযোগ আছে ইচ্ছা করলেই লাইনে ফাঁক ফাঁক করে দাঁড়াতে পারা যায় সেখানেও গায়ে গা ঘেঁষেই দাড়াতে হবে। কিছু বলা মানেই তো উল্টা দু’কথা শোনা। সেবা নিতে কেন দেরি হচ্ছে? লোকদের কাজে এত ধীরগতি কেন? আরো লোক লাগাতে পারেন না? জবাবে যতোই ম্যানপাওয়ার রোস্টারিংয়ের কথা বলি না কেন তারা বুঝতে অক্ষম। আমাদের অনুরোধ- উপরোধ উলুবনে ছড়ানোর মুক্তার মতো না হারিয়ে প্র‌তিমন্তব্যসহ আমাদের দিকেই ফিরে আসে। এসময় হতাশ মনে পেছন ফেরা ছাড়া আর কিছুই করার থাক না।

বর্তমান পরিস্থিতিতিটা ব্যাংকাররা চরম উভয় সংকটে। কারণ একদিকে রোস্টারিং ঐচ্ছিক বিষয় নয় যে, কেউ মানলে মানলো আর না মানলে মানলো না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্র এবং তদালোকে দেশের প্রত্যেকটি তফসিলিভূক্ত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আদেশমূলে ডিউটি রোস্টারিং করে ৫০% জনশক্তির মাধ্যমে দৈনন্দিন ব্যাংকিং কাজ চালানো বাধ্যতামূলক। যাতে বিশেষ পরিস্থিতিতে একসাথে সকল জনশক্তিকে কোয়ারেন্টিইনে না পাঠাতে হয়। রোস্টারিং না হলে গ্রাহককে স্বাভাবিক সেবা দেয়া যাবে বটে, কিন্তু এতে করে একটি শাখার একজন কর্মীও করোনায় আক্রান্ত হলে বাকি সবাইকে দু’সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনে চলে যেতে হবে। আবার শাখাটিও পুরোপুরি লক্ডাউনে থাকবে বলে লেনদেনের কোনোও সুযোগ থাকবে না। কিন্তু এই বাস্তবতা নিয়ে ভাববার মতো লোক কোথায়?

ব্যাংকারদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া এবং তাদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘট‌ছে। এযাবৎ ডাক্তার ২৩, পুলিশ ১৮ সশস্র বাহিনী ১৭ এর পাশে ব্যাংকার ১৫ জনের মৃত্যুর সংখ্যাটাও কিন্তু আছে। তারপরও ব্যাংকারদের ফ্রন্টলাইনার স্বীকৃতি নেই। অথচ তারাও জাতীয় স্বার্থে দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখতে গিয়ে করোনার কবলে পড়েছেন। কিন্তু ডাক্তার, সশস্র বাহিনী এবং পুলিশের জন্য যেরূপ প্রচার প্রচারণা তার ছিঁটেফোটাও নেই ব্যাংকারদের জন্য। ফলে জাতি জানেও না ব্যাংকারদের ত্যাগের কথা। জানে না যে তারাও ঝুঁকিকেন্দ্রে আছেন এবং একই সাথে অন্যদের জন্যও তারা ঝুঁকিপূর্ণ।

ছোটকালে বাসের ভেতর নানা নীতি কথা লেখা দেখতে পেতাম। এর মধ্যে একটি ছিলো এমন যে, “সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশী।” যারা তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নিজের এবং অন্যের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন তাদের নিকট “জীবনের চেয়ে সেবার মূল্য বেশি” হয়ে যাচ্ছে তার খবরই নেই। আর ব্যবহারের কথা? সেটাও তো বাসের ভেতরের লেখা থেকেই শিখেছিলাম যে, ”ব্যবহারেই বংশের পরিচয়।” কিন্তু এখন দেখছি এটা শুধু ব্যাংকারের জন্য বরাদ্দ এবং ব্যাংকারের নিকটই আশা করা হয়।

মোদ্দা কথা কাণ্ডজ্ঞান। একটি বিশেষ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে এক করে দেখার পরিবেশে এর চাইতে ভালো কিছু আশা করাও যায় না। অবশ্য কাণ্ডজ্ঞানটা সবার থাকা জরুরী নয়। শুধুমাত্র সচেতন শিক্ষিত মহলও যদি বুঝেন এবং দায়িত্বশীল আচরণ করেন তাহলেও অনেক ভালো কিছু হতে পারে। কারণ একটি পরিশিলিত সমাজের বৈশিষ্ট্য এও যে, সেসমাজের শিক্ষিত মানুষ যে দিকে যাবেন বাকিওরা সেদিকে ছায়ার মতো তাদের অনুসরণ করবে।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক এবং ব্যাংকার

(লেখকের ফেসুবুক থেকে সংগৃহীত)

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41