মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ১১:৫৪ অপরাহ্ন

রমজান ও ঈদ অর্থনীতিতে ধস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম রবিবার, ২৪ মে, ২০২০
  • ৭০২ বার পঠিত

এম. এ. মাসুম

রমজান ও ঈদুল ফিতর মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসবের মৌসুম। রমজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারায় পরিবর্তন আসে, সে সাথে পরিবর্তন আসে দেশের বিভিন্ন আর্থিক ও ধর্মীয় স্থানগুলোতে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিপণিবিতান, বাজারগুলোর পথের ধারে, বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার ফুটপাথসহ বিভিন্ন স্থানে বসেছে ইফতারী বাজার। মূলতঃ রমজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। কিন্তু এ বছর রমজানে ঢাকা শহর সহ সারা দেশের হাট বাজারগুলোরত যেন খাখা করছে। নেই কোন রমজান কেন্দ্রিক কোলাহল, কেনাকাটার ব্যস্ততা।

এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের বহু প্রতিক্ষীত মহা আনন্দের দিন ”ঈদ-উল-ফিতর” আসে। ঈদ সারা বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দঘন দিন। অর্থনীতিবিদদের মতে নানা ধরনের সঙ্কটের মধ্যেও গত বছরও ঈদে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশী আর্থিক লেনদেন হয়েছে।

প্রবাসীরা ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়ে থাকে। বিভিন্ন ব্যাংকগুলো তাদের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোয় উৎসাহিত করার জন্য গ্রাহকদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ চালু করে থাকে। অন্যদিকে পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও পন্যসামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তাদের বিপুর পরিমাণ ঋণ দেয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এসব অর্থ প্রবাহ চলে যায় ঈদ বাজারে। ঈদে সব বয়সী মানুষই নিজেকে পরিপাটি ও সুন্দরভাবে তুলে ধরা জন্য চেষ্টা করে। ঈদে চাই নতুন জামা কাপড় সে সাথে নতুন আসবাপত্র ইত্যাদি। তাই সব সময় ঈদকে সামনে রেখে ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠে দেশের বিভিন্ন সপিং মল, বিপণী বিতার এমনকি ফুটপাথও। ঈদের মাসে যেমন সারা দেশের শপিংমল বা মার্কেটগুলো গতিশীল হয় সেসাথে সারা দেশের কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, দেশীয় বুটিক হাউজগুলোতেও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে এবং বাড়ে আর্থিক লেনদেন।

ঈদের ছোঁয়া লাড়ে গ্রামের ছোট বাজার থেকে জেলা শহর, বিভাগীয় শহর সব জায়গায়। এসব জায়গায় থাকে উপচে পড়া ভিড়, ব্যস্ত সময় অতিক্রম করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। ক্রেতারা দৌড়াতে থাকের এক বাজার থেকে আরেক বাজারে। বিক্রেতারাও নির্ঘুম সময় অতিক্রম করেন ক্রেতাদেরকে পছন্দমত পন্য সরবরাহ করার জন্য। উচ্চ বিত্তের ক্রেতারা ছুটে বেড়ান ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ আমেরিকার নামিদামি মার্কেটগুলোতে।

ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ ছাড় ঘোষনা দিয়ে থাকে। তাছাড়া, বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরার ঈদের নানা প্যাকেজ ঘোষনা করে। রোজা ও ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন ব্যাংকগুলোও নানা প্যাকেজ ঘোষনার প্রতিযোগিতা চলে। মাসব্যাপী মাস্টারকার্ড, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডধারী লাইফস্টাইল পণ্যের বহু আউটলেটে মূল্যছাড় ঘোষনা করে থাকে।

ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতেও ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। সনামধন্য লেখক লেখিকার সমন্বয়ে পত্র পত্রিকাগুলো বের করে ঈদ সংখ্যা। অন্যদিকে রেডিও এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঈদ পলক্ষে নাটক, সিনেমা তৈরী ও প্রচার নিয়ে দারুন ব্যস্ত হয়ে উঠে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবাহ বেড়ে যায় মিডিয়া জগতেও। ঈদ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নরসুন্দর থেকে শুরু করে ঢাকার নামিদামি বিউটি পার্লার। কাপড় শেলাইয়ের জন্য দর্জির দোকানগুলোতে কাজের ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুন। শুধু তাই নয় তাঁতি, বুটিক হাউস, ডিজাইনার, কারুশিল্পী সবাই দারুন ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দর্জির দোকানের কারিগরদের চোখে ঘুম থাকেনা, রাতদিন কাপড় শেলাই করে যায়।

এ বছরে ঈদের ব্যস্ততাগুলো যেন শুধুই স্মৃতি। প্রাণঘাতি নভেল করোনাভাইরাসের আঘাতে বিপর্যস্ত পুরো বিশ্ব। অদৃশ্য এক শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের ধনী দরীদ্র্য, ছোট বড় সব রাষ্ট্রের অর্থনীতি। গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে চলছে সাধারণ ছুটি ও অঘোষিত লকডাউন। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য, কল কারখানা এবং যান চলাচল। স্থবির হয়েছে দেশের অর্থনীতির চাকা। স্মরনকালের ভয়াবহ ধস নেমেছে দেশের আমদানি রফতানি বানিজ্যে। বন্ধ হয়ে গেছে রমজান ও আসন্ন ঈদ কেন্দ্রিক সমস্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম।

গত ১০ মে থেকে সরকার দোকান পাট, মার্কেট, শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলো খোলার অনুমতি দিলেও তাতে ভোক্তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি মার্কেট চালু করার সুযোগ পেয়েও করোনা সংক্রমণ রোধ করতে বড় বড় শপিংমলগুলো বন্ধ রেখেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এখন টুকটাক নিত্যপণ্যের কেনাকাটা চলছে মার্কেট থেকে মার্কেটে।

এদিকে, করোনা আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশা বিরাজ করছে। কেনাকাটা করার মতো এক শ্রেণীর মানুষের হাতে টাকা পয়সা থাকার পরও অনেকে মার্কেটে যাচ্ছেন না। আবার করোনার কারণে কেনাকাটা করার মতো সাধারণ মানুষের হাতে পর্যাপ্ত অর্থকড়িও নেই। ফলে এই সঙ্কটের মধ্যে ঈদের মার্কেট জমার আর কোন সম্ভাবনা দেখছে না বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।

ইতোমধ্যেই দেশের ৩০ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ৪ শত মানুষ। প্রতিদিনই আক্রান্তের হার বাড়ছে। ফলে আতঙ্কে নিজ গৃহে বন্দি জীবন যাপন করছেন দেশের ১৬ কোটি মানুষ। করোনা ভাইরাস মহামারিতে সারা বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছেন ৫২ লক্ষ এবং মৃত্যু বরণ করেছেন প্রায় ৩ লক্ষের বেশি মানুষ। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

জানা গেছে, করোনায় বিপর্যয় নেমে এসেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। ঈদের মতো উৎসব কেন্দ্রিক বাণিজ্যও এর বাইরে নয়। ঈদ ঘিরে প্রতিবছর দেশে বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। এবারে সেই বাণিজ্যে ধস নেমে গেছে। এর আগে লকডাউনের মুখে বাংলা নববর্ষের ব্যবসা করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা।

সীমিত পরিসরে দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুললেও জমেনি ঈদ বাজার। তবে যে কয়টি দোকান খুলেছে তাতেও নেই ঈদের আমেজ। করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর কিছুটা ভিন্নভাবেই দিনটি উদ্যাপন করতে হবে দেশবাসীকে। তাই বেচাবিক্রি না থাকায় হতাশার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

বেসরকারী গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনার কারণে এবারের ঈদ বাজার হবে অর্থনীতির জন্য নিরাশার। এ বছর ঈদে লাখ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, যারা ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

স্তব্ধ হয়ে আছে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হাত। মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন লক্ষ লক্ষ প্রবাসী। বহু প্রবাসী ইমোমধ্যেই খালি হাতে দেশে ফেরেছেন। ফলে রেমিট্যান্সে মারাত্মক নেতিবাচক প্রবাহ দেখা দিয়েছে।

ঢাকার দরজি দোকানগুলোর ঝাঁপ বন্ধ, স্তব্ধ, নীরব। গুলিস্তান এলাকার ঝাঁপ বন্ধ দরজির দোকানগুলোর মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রায় দুই মাস হতে চলল তাঁদের দোকান-কারখানা সব বন্ধ। কারিগরদের বেতন দিতে পারছেন না, তাঁদের বাড়িতে খাবার নেই। মালিকদের লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। ধারকর্জও পাওয়া যাচ্ছে না।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে অবররুদ্ধ অবস্থায় দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ যে সংকটে পড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেসরকারি দুটি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে যে দেশে ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে শহরের ৭১ শতাংশ দরিদ্র মানুষের।

আকস্মিক মহামারী করোনাভাইরাস দেশের সবকিছুকে স্থবির করে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। ব্যাংক পাড়াতেও নিস্তব্ধ নিরবতা। বাণিজ্যিক এলাকায় কিছু ব্যাংক খোলা থাকলেও দেশের অধিকাংশই বন্ধ।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের অবস্থা সবচেয়ে সূচনীয়। স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগার নেই। ফলে একদিকে খাবার কিনতেও পারছেন না, অপরদিকে সামাজিক মর্যাদার কারণে কারও কাছে চাইতেও পারছেন না। নীরবেই কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বর্তমানে মধ্যবিত্ত যে পর্যায়ে আছে, তা হয়তো সহনীয়। কিন্তু অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এরাই সবচেয়ে বিপদে পড়বেন।

বিশ্ব বিপর্যয় সৃষ্টিকারী করোনা বাংলাদেশেও ভয়ংকরভাবে এগোচ্ছে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি কত হবে, সেটি এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যেই সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে গেছে। তারা গ্রামে চলে গেছেন। যারা ক্ষুদ্র কোনো কাজ করতেন বা কাজের বুয়া, রিকশাচালক, ছোট ছোট কারখানার কর্মী, মুদি দোকানের কর্মী, টেইলার্সের কর্মী, বিক্রয়কর্মী এরকম লোকজন। তাদের আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে।

ঢাকা শহরের ব্যস্ত বিপনি বিতানগুলো প্রায় তিন মাস হল বন্ধ। ঢাকা শহর বলতে গেলে শুন সান নিরবতা, নেই কোন কোলাহল, শুধু বেড়েছে পাখির কলরব। রমজানের আগে নব বর্ষও পালিত হল নিস্তব্ধ নিরবতায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার আঘাতে হারিয়ে গেল এ বছরের লক্ষ কোটি টাকার বেশি ঈদ অর্থনীতি সে সাথে এর নেতিচাক প্রভাব প্রড়েছে দেশের গ্রামীন অর্থনীতিতেও।

লেখকঃ ব্যাংকার

ইমেইলঃ ma_masum@yahoo.com

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2019 Bankbimabd
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com
themebazarbankbimabd41